ডেস্ক: ইউরোপজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক প্রস্তুতি মহড়া বা “মিলিটারি রেডিনেস ড্রিল” উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু সেনাবাহিনীর অনুশীলন নয়, বিভিন্ন দেশ এখন সাধারণ নাগরিকদের জন্যও জরুরি নির্দেশিকা প্রকাশ করছে।যুদ্ধ বা বড় সংকট হলে কী করতে হবে, কীভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে,কেন এখন এই পরিবর্তন?
২০২৪-২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপে সামরিক প্রস্তুতি বা ‘মিলিটারি রেডিনেস ড্রিল’ ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতি নির্দেশিকা জারি করা হচ্ছে। এর মূল কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সম্ভাব্য বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা। যুদ্ধটি সরাসরি ইউরোপীয় ভূখণ্ডে বড় আকারে না ছড়ালেও এর প্রভাব পড়েছে জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা নীতিতে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি সতর্ক হয়ে উঠেছে।এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউরোপের সীমান্তবর্তী দেশগুলো, বিশেষ করে পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ইউরোপীয় সরকারগুলো এখন মনে করছে, এই যুদ্ধ কেবল ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইউরোপের অনেক দেশ যেমন- সুইডেন, ফিনল্যান্ড এখন শুধু সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে ‘টোটাল ডিফেন্স’ বা সামগ্রিক প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করেছে। এর মানে হলো, যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।এসব দেশে তাদের নাগরিকদের কমপক্ষে ৭২ ঘণ্টা কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়াই নিজেদের খাদ্য, পানি এবং ওষুধের ব্যবস্থা রাখতে নির্দেশিকা দিচ্ছে। এটি চরম বিপর্যয়ের সময় সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার্থে জরুরি।
জার্মানি এবং অন্যান্য দেশ ২০২৬ সাল থেকে সামরিক পরিষেবা পুনর্বহালের পরিকল্পনা করছে, যেখানে ১৮ বছর বয়সীদের জন্য নিজ দেশের প্রতিরক্ষায় কাজ করার একটি সাধারণ কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
বড় পরিসরে সেনা মোতায়েন, অনুশীলন,যৌথ সামরিক মহড়া,এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার পরীক্ষা এসব এখন নিয়মিত হচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।এই উদ্যোগগুলোতে সমন্বয় করছে NATO, যা সদস্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে।
কিছু ইউরোপীয় দেশ নাগরিকদের জন্য নির্দেশিকা দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে,জরুরি অবস্থায় অন্তত কয়েক দিনের খাবার ও পানি মজুত রাখা,ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিস প্রস্তুত রাখা,এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হবে এইসব।এই ধরনের নির্দেশিকা আগে মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে দেখা যেত। এখন তা নিরাপত্তা নীতির অংশ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে গেছে।
এখন শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়,বরং সাইবার আক্রমণ,
বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন,এবং তথ্য ব্যবস্থায় আঘাত এসবও বড় ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে সরাসরি যুদ্ধের বাইরেও ইউরোপ ‘গ্রে জোন’ বা হাইব্রিড যুদ্ধের মুখোমুখি হচ্ছে, যার মধ্যে সাইবার হামলা, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি গ্রিডে নাশকতামূলক কার্যক্রম, এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। নাগরিকদের এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতন ও প্রস্তুত থাকতে বলা হচ্ছে।
World Economic Forumএর মতে, “হাইব্রিড থ্রেট” বা বহুমাত্রিক হুমকি এখন বাস্তবতা,যার ফলে সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রই প্রভাবিত হয়।
এই বাস্তবতায় সরকারগুলো শুধু সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর না করে পুরো সমাজকে প্রস্তুত করতে চাইছে।
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্য, জ্বালানি বা যোগাযোগ সংকট দেখা দিলে দ্রুত সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।তাই আগাম প্রস্তুতি সরকারগুলোর জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হয়ে উঠেছে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, অতিরিক্ত সতর্কতা মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি করতে পারে।
আবার অন্যরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি ছাড়া বিকল্প নেই।
ইউরোপে এই সামরিক প্রস্তুতি জানান দিচ্ছে যে, স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে এই প্রথম সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকটের মুখে মহাদেশটি। তারা সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের জন্য নিজেদের ‘পুরোপুরি তৈরি’ রাখতে চায়
এটি একটি পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়,
এই প্রস্তুতি কি বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাস?
নাকি এটি কেবল সতর্কতার অংশ?
উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার,
ইউরোপ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত থাকতে এবং যেকোন অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবেলা করার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


