ডেস্ক: আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন একটি নির্ধারক উপাদান। নজরদারি, টার্গেটিং, এমনকি সরাসরি হামলা সব ক্ষেত্রেই ছোট থেকে মাঝারি আকারের ড্রোন ব্যবহারের হার দ্রুত বেড়েছে।
এরই সাথে সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে “ড্রোন জ্যামিং” প্রযুক্তি,যার মাধ্যমে ড্রোনের যোগাযোগ বা নিয়ন্ত্রণ সংকেত ব্যাহত করে তাকে অকার্যকর করা হয়।
ফলে প্রশ্ন উঠছে,এই প্রতিযোগিতায় কোন দেশগুলো এগিয়ে?
ড্রোন জ্যামিং মূলত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা ইলেকট্রনিক যুদ্ধের অংশ। ড্রোন সাধারণত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা জিপিএস সিগন্যালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জ্যামিং প্রযুক্তি এই সিগন্যালকে বিঘ্নিত করে, ফলে ড্রোন পথ হারায়, নিয়ন্ত্রণ হারায় বা মাটিতে নেমে আসে।
২০২৬ সালের প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ড্রোন জ্যামিং বা পাল্টা-ড্রোন প্রযুক্তিতে আকাশ নিয়ন্ত্রণে প্রধানত চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া এগিয়ে থাকলেও, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উৎপাদন সক্ষমতায় চীন বর্তমানে দ্রুতগতিতে সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই প্রযুক্তির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ-এ। যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষই ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে এবং একই সঙ্গে জ্যামিং প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে একে অপরের ড্রোন নিষ্ক্রিয় করতে।
এই যুদ্ধে রাশিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে।রাশিয়ার ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম দীর্ঘদিন ধরে উন্নত, এবং তারা যুদ্ধক্ষেত্রে জিপিএস জ্যামিং ও সিগন্যাল ব্লক করার ক্ষেত্রে কার্যকর সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাদের S-400 সিস্টেম ড্রোন ও মিসাইল শনাক্তকরণে শক্তিশালী।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এই খাতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।তাদের প্রযুক্তি শুধু সামরিক নয়, বেসামরিক অবকাঠামো সুরক্ষাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে যেমন বিমানবন্দর বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্র জ্যামিং প্রযুক্তিতে অত্যাধুনিক এআই-চালিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। Dedrone এবং DroneShield এআই-ভিত্তিক সিস্টেমের মাধ্যমে বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করছে। পেন্টাগন অটোনোমাস সিস্টেমের জন্য ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল চেয়েছে
চীনও দ্রুত এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
চীনা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম তৈরি করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারেও দেখা যাচ্ছে।চীন ড্রোন উৎপাদন এবং পাল্টা-ড্রোন প্রযুক্তি, উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষস্থানে রয়েছে। চীনের ‘Low Altitude Guardian’ সিস্টেম ৮ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত ড্রোন জ্যাম করতে সক্ষম। এছাড়া, চীন এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ঝাঁক ও তা জ্যাম করার প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে।
এই দেশগুলোর বাইরে ইউরোপের কয়েকটি দেশও নিজস্ব প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে, বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার জন্য।
তবে ড্রোন জ্যামিং শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়,এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।সব ড্রোন একইভাবে কাজ করে না। কিছু ড্রোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রোগ্রাম করা থাকে, যা জ্যামিংয়ের পরও নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
আবার জ্যামিং করলে আশপাশের অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হতে পারে যা বেসামরিক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
World Economic Forum এর মতে, ড্রোন এবং অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে।এখন শুধু ড্রোন বানানোই নয়,
বরং প্রতিপক্ষের ড্রোন নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালে ড্রোন জ্যামিং প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে চীন তাদের উৎপাদন সক্ষমতা এবং এআই প্রযুক্তির কারণে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়,
ভবিষ্যতের আকাশ কে নিয়ন্ত্রণ করবে?
ড্রোন, নাকি তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা?
উত্তর এখনো নির্ধারিত নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত,
আকাশপথে প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে যাচ্ছে।


