ভারতের মণিপুরের মেনাশে সম্প্রদায়ের ইসরায়েলে স্থায়ী বসতি হারানো ইহুদি পরিচয় নাকি রাজনৈতিক পুনর্বাসন

ডেস্ক: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল মনিপুর এর পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করা একটি ছোট জনগোষ্ঠী ‘বনি মেনাশে’ গত কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আলোচিত হচ্ছে। তাদের দাবি, তারা প্রাচীন ইসরায়েলের হারিয়ে যাওয়া গোত্রের বংশধর। আর সেই দাবি ঘিরেই তাদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে ইসরাইলে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েছে।

প্রশ্ন উঠছে,এটি কি সত্যিই হারানো ইহুদি পরিচয়ের পুনরুদ্ধার, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক বা কৌশলগত পুনর্বাসনের হিসাব?

ঐতিহাসিকভাবে ‘বনি মেনাশে’ নামটি এসেছে বাইবেলের ‘মনাশে’ গোত্র থেকে, যা ইসরায়েলের ১২টি প্রাচীন গোত্রের একটি বলে ধরা হয়। বিশ্বাস করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে Assyrian Exile এর সময় এই গোত্রের একটি অংশ পূর্বদিকে সরে যায় এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

এই তত্ত্বের ভিত্তিতে মেনাশে সম্প্রদায়ের একটি অংশ নিজেদের ইহুদি বলে দাবি করে আসছে। তবে
ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

অনেক গবেষক বলছেন, এই দাবির পক্ষে শক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক বা লিখিত প্রমাণ খুব সীমিত।
ধর্মীয় দিক থেকে বিষয়টি আরও জটিল।

Judaism অনুযায়ী, ইহুদি পরিচয় সাধারণত মাতৃসূত্রে নির্ধারিত হয় বা আনুষ্ঠানিক ধর্মান্তরের মাধ্যমে স্বীকৃতি পায়। এই কারণেই মেনাশে সম্প্রদায়ের সদস্যদের অনেক ক্ষেত্রেই ইসরায়েলে যাওয়ার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করতে হয়েছে।

এই প্রক্রিয়াটি তদারকি করেছে Chief Rabbinate of Israel, যারা যাচাই-বাছাইয়ের পর তাদের ধর্মান্তর স্বীকৃতি দেয়।

এদিকে এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রেখেছে Shavei Israel নামের একটি সংস্থা। তারা দাবি করে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা “হারিয়ে যাওয়া ইহুদি” জনগোষ্ঠীকে খুঁজে বের করে ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনা তাদের লক্ষ্য।

তবে সমালোচকরা বলছেন, বিষয়টি শুধুই ধর্মীয় নয়,এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত দিকও জড়িত থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই “Law of Return” নীতির মাধ্যমে বিশ্বের ইহুদিদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে। এর ফলে নতুন অভিবাসীরা দেশটির জনসংখ্যা ও শ্রমবাজারে ভূমিকা রাখছে।

এই প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ মনে করেন, মেনাশে সম্প্রদায়ের পুনর্বাসন আংশিকভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে। যদিও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, কয়েক হাজার মেনাশে সম্প্রদায়ের মানুষ ইতোমধ্যে ইসরায়েলের বিভিন্ন বসতিতে স্থায়ী হয়েছেন। তারা হিব্রু ভাষা শিখছেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন এবং অনেকেই কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়।
নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো,ভাষাগত বাধা,এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্য এসব বিষয় তাদের সামনে বড় বাস্তবতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে মিজোরাম ও মনিপুর এ থাকা মেনাশে সম্প্রদায়ের বাকি সদস্যরাও একই সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।

ধর্মীয় আলোচনায়, ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও “বনি ইসরাইল” বা ইসরায়েলি গোত্রের উল্লেখ রয়েছে। Quran-এ তাদের ইতিহাস, নবীদের ঘটনা এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো আধুনিক জনগোষ্ঠীকে সেই হারানো গোত্র হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে ইসলামিক সূত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
হাদিসেও বনি ইসরাইলের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু মেনাশে সম্প্রদায়ের মতো কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বর্তমান পরিচয় নিয়ে সরাসরি উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তবে বিভিন্ন ইসলামিক স্কলারদের মতে, বর্তমান সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদের এইরকম একত্রিত হওয়া কেয়ামতের অন্যতম একটি বড় নিদর্শন। এই সমবেত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো তারা দাজ্জালের অপেক্ষায় আছে, যে তাদের নেতৃত্ব দেবে এবং পরবর্তীতে ঈসা (আ.)-এর হাতে তারা পরাজিত হবে।

ইহুদিদের নিয়ে হাদিসে শেষ জমানায় মুসলিমদের সাথে তাদের যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী এবং তাদের অবাধ্যতার কারণে শাস্তির উল্লেখ রয়েছে।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ততক্ষণ পর্যন্ত কেয়ামত হবে না, যতক্ষণ না মুসলমানরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। মুসলমানরা তাদের হত্যা করবে। এমনকি ইহুদিরা পাথর বা গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে, তখন পাথর বা গাছ বলবে,”হে মুসলিম, হে আল্লাহর বান্দা! আমার পেছনে ইহুদি লুকিয়ে আছে, এসো, তাকে হত্যা করো।” তবে গারকাদ গাছ যা ইহুদিদের গাছ নামে পরিচিত সেকথা বলবে না।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৬৯৮৫; সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৯২৬)

সব মিলিয়ে, মেনাশে সম্প্রদায়ের ইসরায়েলে পুনর্বাসন একটি বহুস্তরীয় বিষয়।এখানে ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি এবং বাস্তব জীবন একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

এটি কি সত্যিই হারানো পরিচয়ের ফিরে পাওয়া?
নাকি আধুনিক রাষ্ট্রনীতির একটি অংশ?
এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত,এই গল্পটি শুধু একটি জনগোষ্ঠীর নয়, বরং পরিচয়, বিশ্বাস এবং বিশ্বরাজনীতির এক জটিল প্রতিচ্ছবি।

আরো খবর ➔
জরুরি কারণ ছাড়া বের হলেই কঠোর শাস্তি