ডেস্ক: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া-জুড়ে একের পর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, জ্বালানি খাতের নির্বাহী এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর অস্বাভাবিক মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
কারও মৃত্যু ‘আত্মহত্যা’, কারও ‘দুর্ঘটনা’, আবার কোথাও ‘পারিবারিক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ঘটনাগুলোর সময়, প্রেক্ষাপটে মিল থাকার প্যাটার্ন নিয়ে প্রশ্ন থামছে না।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়া এবং বিদেশে রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, তেল-গ্যাস খাতের নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। এই ঘটনাগুলোকে অনেক সময় “Sudden Russian Death Syndrome” বা “Sudden Oligarch Death Syndrome” বলে অভিহিত করা হচ্ছে।
২০২২ সালের পর থেকে এইসব মৃত্যুর ঘটনার দিকে নজর দিলে কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা বড় জ্বালানি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কেউ ছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাবেক কিংবা বর্তমান কর্মকর্তা।
কিছু ঘটনায় দেখা গেছে,নিজ বাসা বা অফিসের উঁচু স্থান থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে কারো , আবার কোথাও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বা অস্বাভাবিক পারিবারিক পরিস্থিতির উল্লেখ পাওয়া গেছে।
উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে Gazprom-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নির্বাহী কর্মকর্তার নাম, যাদের মৃত্যু বিভিন্ন সময়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।
একইভাবে Lukoil-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির মৃত্যুও আলোচনায় এসেছে।
রাশিয়ার ভেতরে এসব ঘটনাকে অনেক সময় আলাদা আলাদা দুর্ঘটনা বা ব্যক্তিগত কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতাকারী বা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সন্দেহজনক আচরণকারী এলিটদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য এই ঘটনাগুলো ঘটানো হতে পারে।
অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এই ঘটনাগুলোর পেছনে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা বা পুতিনের কড়া সমালোচকদের দমিয়ে রাখার প্রয়াস থাকতে পারে।
নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করা United Nations Office on Drugs and Crime এর মতে, যখন একই ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু ধারাবাহিকভাবে ঘটে, তখন তা “প্যাটার্ন অ্যানালাইসিস”-এর আওতায় পড়ে।অর্থাৎ ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক খোঁজা হয়।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
প্রথমত, রাজনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
বিশেষ করে Russia-Ukraine War শুরুর পর রাশিয়ার অর্থনীতি ও ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে,এমনটাই ধারণা কিছু বিশ্লেষকের।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত।
জ্বালানি খাত রাশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।
এই খাতে সিদ্ধান্ত, মালিকানা বা সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে তার প্রভাব বড় হতে পারে।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কারণ।
সব ঘটনাই যে পরিকল্পিত, এমন নয়।কিছু ক্ষেত্রে মানসিক চাপ, আর্থিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত সংকটও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এখানেই আসে বড় প্রশ্ন,
এতগুলো ঘটনা কি কেবল কাকতালীয়?
World Economic Forum এর মতে, উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তি বা কৌশলগত খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে তা শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না,বরং তা বৃহত্তর কাঠামোগত ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
রাশিয়া সরকার এসব অভিযোগ বা সন্দেহকে সাধারণত গুরুত্ব না দিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তের ওপর জোর দেয়। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এছাড়া মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বলছে, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ সীমিত হলে সত্য উদঘাটন কঠিন হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে, সার্গেই প্রোটোসেনিয়া,ভ্লাদিস্লাভ অভয়েভ,রাভিল ম্যাগানভ, থেকে শুরু করে সর্বশেষ সার্গেই লুইতনার রাশিয়ায় এই ধারাবাহিক মৃত্যুগুলো একই ছন্দে গাথা। প্রত্যেকটা মৃত্যু খুবই সন্দেহজনক এবং অস্পষ্ট।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—
এই ঘটনাগুলো কি সত্যি আলাদা আলাদা দুর্ঘটনা,
নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো অদৃশ্য প্যাটার্ন?
নির্দিষ্ট উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার,
এই ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে,
এবং ভবিষ্যতে এসব ঘটনার দিকে আরও গভীরভাবে নজর রাখা হবে।


