ডেস্ক: পৃথিবীর কক্ষপথ আজ শুধু বিজ্ঞান বা যোগাযোগের ক্ষেত্র নয়,এটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চ। স্যাটেলাইট এখন নেভিগেশন, ব্যাংকিং, ইন্টারনেট, এমনকি সামরিক যোগাযোগের জন্যও অপরিহার্য। ফলে এই স্যাটেলাইটগুলোকে অকার্যকর বা ধ্বংস করার সক্ষমতা যা
“অ্যান্টি-স্যাটেলাইট” বা ASAT প্রযুক্তি নামে পরিচিত,এই সক্ষমতা নিয়ে বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে অ্যান্টি স্যাটেলাইট অর্জনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। বর্তমান তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ভারত এই চারটি দেশের হাতে স্যাটেলাইট ধ্বংস করার প্রমাণিত প্রযুক্তি রয়েছে
তবে কার হাতে সক্ষমতা বেশি, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতভেদ রয়েছে।
মহাকাশ প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে বড় শক্তিগুলো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে মহাকাশকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে National Aeronautics and Space Administration এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীর কক্ষপথে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ঘুরছে, যেগুলোর একটি বড় অংশই বিভিন্ন দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র।
প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে এগিয়ে।যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উন্নত মিসাইল প্রযুক্তি, সাইবার সক্ষমতা এবং স্পেস-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। তারা সরাসরি স্যাটেলাইট ধ্বংসের পরীক্ষা অতীতে করেছে এবং এখন আরও উন্নত পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। তাদের রয়েছে ৪০০টিরও বেশি SM-3 মিসাইল, যা যুদ্ধজাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করা যায় । এছাড়াও তাদের ভূমিভিত্তিক ইন্টারসেপ্টর রয়েছে ।
২০২৬ সালের মধ্যে তারা ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা করছে, যা মহাকাশে লেজার ও কাইনেটিক ইন্টারসেপ্টর স্যাটেলাইট ব্যবহার করে শত্রুর মিসাইল ও স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে সক্ষম ।যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স বর্তমানে মহাকাশে তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে রেকর্ড পরিমাণ তহবিল বিনিয়োগ করছে ।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া।
রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশ প্রযুক্তিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তাদের অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইল পরীক্ষার তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাশিয়া ২০২১ সালে ভূমিভিত্তিক মিসাইল দিয়ে নিজস্ব পুরনো স্যাটেলাইট ধ্বংস করে তাদের ASAT সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে ।
রাশিয়া ‘পারসভাত’ নামক লেজার সিস্টেম মোতায়েন করেছে যা স্যাটেলাইটের সেন্সরকে অচল করতে পারে । এছাড়া ‘কসমস ২৫৫৩’ নামের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে
তৃতীয়ত, চীন।
চীন মহাকাশে দ্রুত তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।২০০৭ সালে চীন একটি স্যাটেলাইট ধ্বংসের পরীক্ষা চালায়, যা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। এরপর থেকে দেশটি এই খাতে আরও বিনিয়োগ করছে।
তারা ভূমিভিত্তিক মিসাইল ব্যবহার করে স্যাটেলাইট ধ্বংস করতে সক্ষম।
চীনারা ‘কো-অরবিটাল’ প্রযুক্তি,অর্থাৎ, শত্রুর স্যাটেলাইটের খুব কাছে গিয়ে ধ্বংস বা অচল করার কৌশল উন্নত করছে । ২০২৪-২৫ সালে তারা রোবোটিক আর্মযুক্ত উপগ্রহ ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়েছে ।
এছাড়া চীন ভূমিভিত্তিক লেজার সিস্টেম তৈরি করেছে যা মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইটের সেন্সরগুলোকে অন্ধ বা অচল করে দিতে সক্ষম
চতুর্থত, ভারত।
২০১৯ সালে ভারত নিজস্ব স্যাটেলাইট ধ্বংস করে দেখায়, যা তাদের এই সক্ষমতার তালিকায় যুক্ত করে।
এই দেশগুলোর পাশাপাশি আরও কিছু দেশ প্রযুক্তিগতভাবে এগোচ্ছে, যদিও তাদের সক্ষমতা এখনো সীমিত।
তবে স্যাটেলাইট ধ্বংস শুধু মিসাইলের মাধ্যমে হয় না।
আরও কিছু পদ্ধতি রয়েছে।সাইবার আক্রমণ,
জ্যামিং বা সংকেত বন্ধ করা,এমনকি “কো-অরবিটাল” প্রযুক্তি,যেখানে একটি স্যাটেলাইট অন্যটির কাছে গিয়ে তাকে অকার্যকর করে।এই কারণে মহাকাশের যুদ্ধ এখন বহুস্তরীয় হয়ে উঠছে।
United Nations Office for Outer Space Affairs এর মতে, স্যাটেলাইট ধ্বংসের ফলে “স্পেস ডেব্রিস” বা মহাকাশে ভাসমান ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের স্যাটেলাইট ও মহাকাশ মিশনের জন্য বড় ঝুঁকি।
অর্থাৎ, একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করলে শুধু সামরিক সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ব নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা World Economic Forumএর মতে, মহাকাশ এখন “ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার” অর্থাৎ এমন একটি ক্ষেত্র, যার ওপর আধুনিক জীবনের অনেক কিছু নির্ভর করে।
ফলে এখানে যেকোনো সংঘাতের প্রভাব পৃথিবীতেও সরাসরি পড়তে পারে।এর কারনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে,নেভিগেশন সিস্টেম ব্যাহত হতে পারে,
এমনকি অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজন।
তবে এখনো পর্যন্ত এই বিষয়ে শক্তিশালী বৈশ্বিক সমঝোতা গড়ে ওঠেনি।
সব মিলিয়ে, স্যাটেলাইট ধ্বংসের সক্ষমতা কয়েকটি বড় শক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলেও, এই প্রযুক্তির উন্নয়ন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়,
মহাকাশ কি ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠছে?
নাকি এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুন নিয়ম তৈরি হবে?
উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার,
পৃথিবীর বাইরে, মহাকাশেও এখন শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।মহাকাশে এই প্রতিযোগিতা স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল আধুনিক যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।


