আইসল্যান্ডে আগ্নেয়গিরির অস্বাভাবিক অগ্নুৎপাত—পুরো শহর খালি করার মতো পরিস্থিতি কেন তৈরি হচ্ছে?

ডেস্ক: উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য যেমন পরিচিত, তেমনি আগ্নেয়গিরির দেশ হিসেবেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির কিছু এলাকায় আগ্নেয়গিরির অস্বাভাবিক অগ্নুৎপাত এবং তার আশঙ্কা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পুরো শহর খালি করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে । বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমের রেকজেনেস উপদ্বীপে আগ্নেয়গিরির যে অস্বাভাবিক ও ঘনঘন অগ্নুৎপাত দেখা যাচ্ছে। এটি প্রায় ৮০০ বছরের সুপ্তাবস্থার পর সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে,কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?

আইসল্যান্ডোর বারবার আগ্নেয়গিরির অস্বাভাবিক অগ্ন্যুৎপাতের মূল কারণ হলো ওই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতাতা।

আইসল্যান্ড এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে পৃথিবীর দুটি টেকটোনিক প্লেট উত্তর আমেরিকান এবং ইউরেশিয়ান প্লেট ধীরে ধীরে আলাদা হচ্ছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে মাটির নিচে ম্যাগমা বা গলিত শিলা সহজেই উপরে উঠে আসতে পারে।এই প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করা হয় Plate Tectonics তত্ত্ব দিয়ে।

যেখানে প্লেটগুলোর নড়াচড়ার ফলে ভূত্বকে ফাটল তৈরি হয় এবং সেই ফাটল দিয়েই ম্যাগমা বেরিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে আইসল্যান্ডের রেইকিয়ানেস উপদ্বীপ এলাকায় অস্বাভাবিক ভূমিকম্প ও ভূমি ফাটলের ঘটনা বেড়েছে।এগুলোকে বিজ্ঞানীরা “ম্যাগমা মুভমেন্ট” হিসেবে দেখছেন।

যখন মাটির নিচে চাপ দ্রুত বাড়ে, তখন হঠাৎ করেই অগ্নুৎপাত ঘটতে পারে যা পূর্বাভাস দেওয়া সবসময় সহজ নয়।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো গ্রিন্ডাভিক নামের একটি শহর, যেখানে আগ্নেয়গিরির ঝুঁকি এতটাই বেড়েছিল যে পুরো শহরের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়।মাটিতে ফাটল দেখা দেওয়া, গ্যাস নির্গমন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি সব মিলিয়ে সেখানে বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত শুধু লাভা বের হওয়াই নয়,এর সঙ্গে আরও কিছু বড় ঝুঁকি থাকে।
যেমন—বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন,হঠাৎ বিস্ফোরণ,এবং ভূমি ধসে পড়া।এই কারণে আগাম সতর্কতা হিসেবে পুরো এলাকা খালি করে দেওয়া হয়।

Icelandic Meteorological Office এর মতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আন্দাজ করা যায় ভবিষ্যতে আরও অগ্নুৎপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,এই অঞ্চলে আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ এখন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
অর্থাৎ একবার অগ্নুৎপাতের পর আবারও একই এলাকায় বা কাছাকাছি স্থানে নতুন অগ্নুৎপাত ঘটতে পারে।এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক চক্রের অংশ হতে পারে,যা কয়েক বছর বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বড়ভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে,ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে,এবং অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এছাড়া অগ্নুৎপাতের ফলে সালফার ডাইঅক্সাইডসহ অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

সরকার চেষ্টা করছে নিরাপদ আশ্রয়, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে।তবে বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই আগ্নেয়গিরির কার্যকলাপ সাময়িক নয়, বরং এটি কয়েক দশক বা শতাব্দী ধরে চলতে পারে। এর ফলে গ্রিন্ডাভিক শহরটি যেমন এখন কার্যত বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে, তেমনি এর আশেপাশে অন্যান্য শহরের একই অবস্থা হতে পারে।

তবে, এই অগ্নুৎপাতগুলো সাধারণত স্থানীয় এবং পুরো আইসল্যান্ডে বা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে না।

সব মিলিয়ে, আইসল্যান্ডে আগ্নেয়গিরির এই অস্বাভাবিক অগ্নুৎপাত শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়,এটি একটি চলমান ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়,
এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে?

মানুষ কি স্থায়ীভাবে এই এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে?
উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত,
প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের প্রস্তুতি যতই থাকুক,
ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না।

আরো খবর ➔
স্কটল্যান্ডে ফুটবল ম্যাচ থেকে করোনায় আক্রান্ত ২ হাজার