ডেস্ক: বিদেশে বাংলাদেশি কমিউনিটি মানেই সহযোগিতা, একে অন্যকে সাহায্য করা আর একসাথে এগিয়ে চলা। তবে এই পরিচিত ছবির আড়ালেই অনেক সময় উঠে আসে আরেক বাস্তবতা।
তা হলো “সাইলেন্ট কন্ট্রোল” বা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ।
যেখানে প্রকাশ্যে নেতৃত্বে না থেকেও কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কমিউনিটির সিদ্ধান্ত, সুযোগ আর তথ্যের ওপর প্রভাব রাখছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
কমিউনিটির ভেতরের অনেকেই বলছেন, কিছু নির্দিষ্ট মানুষ বা গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে নীরবে প্রভাব বিস্তার করে আসছে,যা সবসময় চোখে পড়ে না, কিন্তু সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই “সাইলেন্ট কন্ট্রোল” মূলত তিনটি জায়গায় বেশি দেখা যায়।অর্থনীতি, সংগঠন এবং তথ্য প্রবাহে।
প্রথমত, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। প্রবাসে অনেক বাংলাদেশি ছোট ব্যবসা, দোকান, রেস্টুরেন্ট বা ট্রেডিংয়ের সঙ্গে জড়িত। নতুন কেউ এলে পুরোনোদের সহায়তা লাগে কাজ খোঁজা, জায়গা পাওয়া বা ব্যবসা শুরু করতে।
এই জায়গায় কিছু অভিজ্ঞ ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। কিন্তু অভিযোগ আছে, কোথাও কোথাও এই প্রভাব ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লোকদেরই সুযোগ দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি সংগঠন। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন, ক্লাব বা সামাজিক সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান, নির্বাচন বা প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে সিদ্ধান্ত আগেই ঠিক হয়ে যায়, পরে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে স্বচ্ছতা নিয়ে সতর্ক করেছে Transparency International। তাদের মতে, যে কোনো সংগঠনে যদি জবাবদিহিতা কম থাকে, তাহলে অল্প কয়েকজনের হাতে প্রভাব কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
তৃতীয়ত, তথ্য নিয়ন্ত্রণ। চাকরি, ভিসা, ব্যবসা বা আইনি তথ্য অনেক সময় কিছু নির্দিষ্ট মানুষের মাধ্যমে ছড়ায়। এতে তারা তথ্যের “গেটকিপার” হয়ে ওঠেন। নতুনরা তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে অদৃশ্যভাবে একটি প্রভাব তৈরি হয়, যা সবাই বুঝতে পারে না।
এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াও বড় ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ বা অনলাইন কমিউনিটির অ্যাডমিনরা কোন তথ্য থাকবে আর কোনটা থাকবে না সেটা নিয়ন্ত্রণ করেন। এতে তারাও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
তবে বিষয়টি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞ মানুষরাই নতুনদের সাহায্য করেন, সমস্যা সমাধান করেন, কমিউনিটিকে একসাথে বেঁধে রাখেন। ছোট কমিউনিটিতে এমন নেতৃত্ব দরকারও হয়।
কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই প্রভাব স্বচ্ছ না থাকে বা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি না করে। এতে কমিউনিটির ভেতরে অসন্তোষ বাড়ে, বিভক্তি তৈরি হয়।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসী কমিউনিটিতে “ইনফরমাল পাওয়ার” থাকা স্বাভাবিক। কারণ সবাই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে সেই প্রভাব যদি খোলামেলা ও ন্যায্যভাবে ব্যবহার না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এদিকে অনেক প্রবাসী এখন এই বিষয়ে সচেতন হচ্ছেন। তারা চাইছেন,কমিউনিটি সিদ্ধান্তে সবার অংশগ্রহণ,
খোলামেলা আলোচনা,এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা।
সব মিলিয়ে, বিদেশে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে “সাইলেন্ট কন্ট্রোল” একেবারে অস্বীকার করা যায় না, আবার এটিকে একপাক্ষিকভাবেও দেখা ঠিক নয়। কোথাও এটি সহায়ক, কোথাও আবার প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, শক্তিশালী কমিউনিটি গড়তে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং বিশ্বাস যেখানে কেউ অদৃশ্যভাবে নয়, বরং সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়।


