ডেস্ক: বিদেশে থাকা বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন শুধু শ্রমবাজারেই নয়, ব্যবসা, শিক্ষা ও সামাজিক প্রভাবের দিক থেকেও দৃশ্যমান। এর মধ্যেই মাঝে মাঝে একটি প্রশ্ন উঠে আসে,
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কেউ কি “লবিস্ট” হিসেবে কাজ করছেন?
তারা কি সত্যিই গোপন কূটনীতির খেলায় যুক্ত, নাকি বিষয়টি বাস্তবের চেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসছে?
“লবিং” শব্দটি সবসময় নেতিবাচক নয়। অনেক উন্নত দেশে এটি একটি বৈধ প্রক্রিয়া। ব্যবসায়ী, পেশাজীবী বা কমিউনিটি সংগঠন সরকার বা নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরার প্রক্রিয়া হল লবিং।
নীতি ও সমাজ নিয়ে গবেষণা করা Pew Research Center এর মতে, অভিবাসী কমিউনিটিগুলো প্রায়ই নিজেদের অধিকার, ভিসা নীতি, শিক্ষা বা ব্যবসার সুযোগ নিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এটি সাধারণ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও কিছু লবিং কার্যক্রম রয়েছে। বিশেষ করে United Kingdom, United States এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠন, ব্যবসায়ী গ্রুপ বা পেশাজীবীরা স্থানীয় এমপি, কাউন্সিলর বা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
এই যোগাযোগের মূল বিষয়গুলো হলো—
ভিসা জটিলতা,
ইমিগ্রেশন নীতি,
ব্যবসার পরিবেশ,
এবং কমিউনিটির নিরাপত্তা।
অর্থাৎ, এখানে লক্ষ্য থাকে নিজেদের কমিউনিটির স্বার্থ রক্ষা করা।
কিন্তু “গোপন কূটনীতি” কথাটা আসলে কোথা থেকে আসছে?
বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকলে সেটিকে বাইরে থেকে “গোপন প্রভাব” মনে হতে পারে। বিশেষ করে যখন সেই যোগাযোগ খোলাখুলি প্রকাশ করা হয় না, তখন সন্দেহ তৈরি হয়।
Transparency International বলছে, যেকোনো লবিং কার্যক্রম যদি স্বচ্ছ না হয়, তাহলে তা নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। মানুষ তখন ভাবতে পারে,পেছনে অন্য কিছু হচ্ছে।
আরেকটি বিষয় হলো “ইনফরমাল নেটওয়ার্ক” বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ। প্রবাসে একই দেশের মানুষ একে অন্যকে সাহায্য করেন, পরিচিতির মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেন। এই নেটওয়ার্ক কখনো কখনো প্রভাব তৈরি করে। কিন্তু এই প্রভাব আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কূটনীতি,দুটো এক জিনিস নয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বড় কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে হলে প্রয়োজন,
বড় অর্থনৈতিক শক্তি,
রাজনৈতিক সংযোগ,
এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
সাধারণ প্রবাসী কমিউনিটির পক্ষে এই স্তরের প্রভাব তৈরি করা খুবই কঠিন।
তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না,কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী স্থানীয় পর্যায়ে যথেষ্ট প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।
তারা স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন, সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রচারণাতেও যুক্ত থাকেন।
এই প্রভাব কখনো কখনো নীতিনির্ধারণে পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।
যেমন:কোনো এলাকার ব্যবসায়িক সুবিধা, কমিউনিটি সেন্টার, বা অভিবাসী সহায়তা প্রকল্পে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করা।
World Economic Forum এর মতে, গ্লোবালাইজেশনের ফলে অভিবাসী কমিউনিটিগুলো এখন আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত এবং প্রভাবশালী। তবে এই প্রভাব সাধারণত স্থানীয় বা খাতভিত্তিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। সোশ্যাল মিডিয়াও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। কোনো যোগাযোগের ক্লু বা ছবি ভাইরাল হলে সেটিকে বড় করে দেখানো হয়। এতে অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে “ইমেজ” বড় হয়ে যায়।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই বলছেন, তারা মূলত নিজেদের অধিকার, সুযোগ এবং কমিউনিটির উন্নয়ন নিয়েই কাজ করেন। বড় ধরনের গোপন কূটনীতিতে সরাসরি জড়িত থাকার ধারণাকে তারা অতিরঞ্জিত বলেই মনে করেন।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে,
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কিছু লবিং কার্যক্রম আছে,
কিছু প্রভাবও রয়েছে,কিন্তু সেটি মূলত বৈধ ও সীমিত পর্যায়ে।
“গোপন কূটনীতির বড় খেলোয়াড়” হিসেবে তাদের উপস্থাপন অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবের চেয়ে বেশি বড় করে দেখানো হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়,এই প্রভাব ভবিষ্যতে কতটা বাড়বে? বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সংগঠনের শক্তি বাড়লে প্রবাসী কমিউনিটির প্রভাবও বাড়তে পারে। তবে সেটি কতটা স্বচ্ছ এবং ন্যায্য হবে,সেটাই হবে আসল বিষয়।
কারণ প্রভাব থাকাটা সমস্যা নয়,
সমস্যা হয় যখন সেটি অদৃশ্য এবং জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়।


