ডেস্ক: বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই সমুদ্রপথে হয়।
তেল, খাদ্য, কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রযুক্তিপণ্য,সবকিছুই জাহাজে করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যায়।
এই বিশাল ব্যবস্থার মধ্যেই কখনো কখনো পরিবহন হয় সংবেদনশীল বা ঝুঁকিপূর্ণ কার্গো যার মধ্যে থাকতে পারে অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জামসহ আরো নানা রকম পণ্য।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে,এই নেটওয়ার্কে কাজ করা বাংলাদেশি নাবিকরা কি কখনো অজান্তেই এমন কার্গো বহন করছেন?
আন্তর্জাতিক শিপিং একটি বহুস্তরীয় প্রক্রিয়া।
একটি কার্গো জাহাজে কী পণ্য থাকবে, সেটি নির্ধারণ করে কার্গো মালিক, চার্টারার, শিপিং কোম্পানি এবং কখনো কখনো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান।
জাহাজের ক্যাপ্টেন ও ক্রু সেই পণ্য নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু এখানে একটি বাস্তবতা হলো,সব তথ্য সবসময় ক্রুদের কাছে থাকে না।
International Maritime Organizationএর নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বিপজ্জনক বা সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ডকুমেন্টেশন, লেবেলিং এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা থাকা বাধ্যতামূলক।
তবে বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে কার্গোর প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা বা ভিন্ন নামে উল্লেখ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে করে জাহাজের কর্মীরা পণ্যের আসল ব্যবহার বা ঝুঁকি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নাও থাকতে পারেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ও অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে কাজ করা United Nations Office on Drugs and Crime এর মতে, বৈশ্বিক শিপিং রুট কখনো কখনো অবৈধ পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এতে অস্ত্র, মাদক বা নিষিদ্ধ প্রযুক্তি এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।অনেক সময় নিয়মের ফাঁক ব্যবহার করে।
বাংলাদেশি নাবিকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজে কাজ করেন। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার ব্যস্ত বন্দরগুলোতে তাদের নিয়মিত যাতায়াত থাকে। ফলে তারা এই গ্লোবাল শিপিং নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংবাদে দেখা গেছে, সন্দেহজনক কার্গো বহনের অভিযোগে জাহাজ আটক করা হয়েছে। তখন পুরো জাহাজের ক্রুদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু তদন্তে প্রায়ই দেখা যায়,ক্রু সদস্যরা কেবল তাদের দায়িত্ব পালন করছিলেন, কার্গোর পেছনের বাস্তবতা সম্পর্কে তারা জানতেন না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র পরিবহন সবসময় অবৈধ নয়। অনেক দেশ বৈধভাবে অস্ত্র আমদানি-রপ্তানি করে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন সেই পরিবহন গোপনে বা নিয়ম ভেঙে করা হয়।
এই ধরনের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে। যেমন International Maritime Organization নিয়ম তৈরি করে, আর বিভিন্ন দেশের কাস্টমস ও নিরাপত্তা সংস্থা কার্গো যাচাই করে।
তবুও কিছু “গ্রে এরিয়া” থেকে যায়,
যেখানে কার্গো বৈধ কিনা বোঝা কঠিন,
বা কাগজপত্র ঠিক থাকলেও প্রকৃত ব্যবহার অন্য কিছু হতে পারে।
এই জায়গাগুলোতেই ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশি নাবিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারা চাকরির অংশ হিসেবে নির্দেশনা অনুসরণ করেন। অনেক সময় তারা প্রশ্ন করার সুযোগও পান না, বিশেষ করে যদি তারা জুনিয়র পজিশনে থাকেন।
তবে এখন সচেতনতা বাড়ছে।
অনেক নাবিককে বিপজ্জনক পণ্য শনাক্ত করা,কার্গো ডকুমেন্ট বুঝা এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে রিপোর্ট করা এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
শিপিং খাতের অভিজ্ঞদের মতে,যদি কোনো কার্গো অস্বাভাবিক লাগে,ডকুমেন্টে অসঙ্গতি থাকে,
বা নিরাপত্তা নির্দেশনা পরিষ্কার না হয় তাহলে সতর্ক থাকা জরুরি।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক অস্ত্র রুট ও শিপিং একটি জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়।
বাংলাদেশি নাবিকরা এই বিশাল ব্যবস্থার অংশ হলেও, তারা সচেতনভাবে অবৈধ কার্যক্রমে জড়িত এমন প্রমাণ খুবই সীমিত।
তবে অজান্তে ঝুঁকিপূর্ণ কার্গো বহনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শেষ পর্যন্ত, এই খাতে কাজ করা মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় হলো,
সচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং নিয়ম মেনে চলা।
কারণ সমুদ্রপথে কাজ শুধু দায়িত্ব নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে ঝুঁকির মধ্যেও টিকে থাকার লড়াই।


