ডেস্ক: ঢাকার যানজট কমাতে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সড়কে গাড়ির গতি, সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ এবং যান চলাচলের তথ্য এনালাইজ করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে এবং নগরবাসী একটি শৃঙ্খলাপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা পাবেন।
তবে ইউনেস্কোর সাংবাদিক সুরক্ষা নির্দেশিকার আলোকে ভাবলে, এই নিরবচ্ছিন্ন ও শক্তিশালী নজরদারি প্রযুক্তি জননিরাপত্তার আড়ালে ভবিষ্যতে স্বাধীন সাংবাদিকদের গতিবিধি ট্র্যাক করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে।
বিশ্বের অনেক দেশেই এখন এআইচালিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বিশ্লেষণ করে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, দুর্ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করতে পারে এবং জরুরি যানবাহনের জন্য আলাদা পথ তৈরি করতেও সহায়তা করে। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং চীনের বিভিন্ন শহরে এমন প্রযুক্তি ইতোমধ্যে ব্যবহার হচ্ছে।
বাংলাদেশেও স্মার্ট সিটি গড়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতে, রাজধানীর যানজট কমানো, আইন ভঙ্গকারীদের শনাক্ত করা এবং দুর্ঘটনা কমানোর জন্য এআইভিত্তিক ক্যামেরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হয়, তার দায়িত্বশীল ব্যবহারও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আধুনিক এআই ক্যামেরায় প্যান-টিল্ট-জুম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যানবাহনের গতিবিধি অনুসরণ করতে সক্ষম। এর ফলে রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে স্বাধীন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীদের গাড়ি বা রুট ট্র্যাক করতে পারে।
ইউনেস্কোর সাংবাদিক সুরক্ষা কর্মসূচী অনুযায়ী, সাংবাদিকদের অবাধ গতিবিধি ও তথ্যের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার। ব্যাপক মাত্রার এই নজরদারি সংবাদকর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সেলফ-সেন্সরশিপ তৈরি করতে পারে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচও।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বিতর্ক।
যদি কোনো দেশে এই তথ্য ব্যবহারের স্পষ্ট আইন, স্বাধীন তদারকি এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে একই প্রযুক্তি জননিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা জরুরি।
বাংলাদেশে চালু হতে যাওয়া ট্রাফিক ক্যামেরা সাংবাদিকদের নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে এমন কোনো প্রমাণ বর্তমানে নেই। সরকারও এ ধরনের কোনো ঘোষণা দেয়নি।
তাই এটিকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখা উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতীতে নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা তৈরি করেছে। ইউরোপীয় এআই আইন অনুযায়ী, জনসমক্ষে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে অনেক গণতান্ত্রিক দেশেও প্রশ্ন উঠেছে,নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে রাষ্ট্র কতটা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং সেই তথ্য কতদিন সংরক্ষণ করা উচিত।
ডিজিটাল অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি নিজে কখনো ভালো বা খারাপ নয়। এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে সেটি নাগরিকের উপকারে আসবে, নাকি উদ্বেগের কারণ হবে।
যদি এআই ক্যামেরার তথ্য শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে।
কিন্তু যদি একই তথ্য অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অনেক সময় সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত। যদি কোনো সাংবাদিকের প্রতিটি যাতায়াত, অবস্থান বা চলাচল অযথা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের একটি অংশ।
অন্যদিকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের আরেকটি মতও রয়েছে।
তাদের মতে, শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন, আদালতের নজরদারি, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং স্বচ্ছ নীতিমালা থাকলে এ ধরনের প্রযুক্তি নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন না করেই ব্যবহার করা সম্ভব।
অর্থাৎ সমস্যার মূল কারণ প্রযুক্তি নয়, বরং এর ব্যবহারের নিয়ম।
সব মিলিয়ে, ঢাকায় এআই ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর উদ্যোগ একদিকে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, অন্যদিকে এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্য নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন আলোচনারও জন্ম দিয়েছে।


