ডেস্ক: একসময় যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতেন সেনা কমান্ডাররা। লক্ষ্য নির্ধারণ করতেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। আর ট্রিগার টানতেন একজন সৈনিক।অকিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
এখন এমন অস্ত্র তৈরি হচ্ছে, যা নিজেই লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আক্রমণের সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
ফলে নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে,
ভবিষ্যতের যুদ্ধ কি মানুষের হাতে থাকবে, নাকি অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে?
যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর মতো চরম সিদ্ধান্ত এখন আর শুধু সৈনিকের হাতে নেই,এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অ্যালগরিদম নিজে থেকে শত্রু চিহ্নিত করে হামলা চালাচ্ছে। এই স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্রগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ভয়াবহ নৈতিক, মানবিক ও আইনি উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য এবং দক্ষিণ কোরিয়া এই খাতে বড় বিনিয়োগ করছে।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বলতে সাধারণত এমন অস্ত্র ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যা সেন্সর, ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আক্রমণ করতে পারে।
সব অস্ত্র পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তবে উদ্বেগের কারণ হলো,ধীরে ধীরে মানুষের ভূমিকা কমে আসছে।
বিশ্বব্যাপী আলোচিত উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ইউক্রেন যুদ্ধ।
রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই উন্নত ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক লক্ষ্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন থেকে পাওয়া হাজার হাজার ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধকে অনেকেই বিশ্বের প্রথম “এআই-সহায়ক যুদ্ধ” হিসেবে দেখছেন।
আরেকটি আলোচিত উদাহরণ পাওয়া যায় মধ্যপ্রাচ্যে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসরায়েল উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করছে। এসব ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা মনে করেন।
এদিকে ২০২০ সালে লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে তুরস্ক-নির্মিত “কারগু-২” ড্রোনের প্রসঙ্গ উঠে আসে।
কিছু বিশ্লেষক দাবি করেন, এটি সম্ভবত বিশ্বের প্রথম উদাহরণগুলোর একটি, যেখানে একটি ড্রোন সীমিত মাত্রায় মানব নির্দেশনা ছাড়াই লক্ষ্য অনুসরণ করেছে।
যদিও এই ঘটনা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সমর্থকরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে।
প্রথমত, এটি যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের সেনাদের ঝুঁকি কমায়।
দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের তুলনায় দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে।
তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় নজরদারি চালানো বা বিপজ্জনক এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে যে দেশ দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবে, তারাই কৌশলগতভাবে এগিয়ে থাকবে।
কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, ঝুঁকিও কম নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো,যদি অ্যালগরিদম ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে দায় কার?কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রায়ই সেন্সরের তথ্যে বিভ্রান্ত হয়ে বেসামরিক গাড়ি বা নিরীহ মানুষকে শত্রু ভেবে ভুল করতে পারে।
একজন সৈনিক ভুল করলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।কিন্তু একটি সফটওয়্যার ভুল করে কোনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করলে দায় নেবে কে?প্রোগ্রামার?সামরিক বাহিনী?নাকি অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান?
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের লাগাম টানতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোর তৎপরতা চলছে। জাতিসংঘ এবং Stop Killer Robots এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছে। দ্য ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেড ক্রস এবং জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, কোনোভাবেই যেন কোনো এআইভিত্তিক অস্ত্র অর্থবহ মানবিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা না হয়।
অনেক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিজ্ঞানী দাবি করছেন, মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোনো যন্ত্রকে দেওয়া উচিত নয়
তাদের মতে, যুদ্ধের মতো গুরুতর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সবসময় মানুষের হাতেই থাকা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের অস্ত্রের ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে সামরিক শক্তিধর দেশগুলো বলছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো সম্ভব নয়।টতাদের যুক্তি, প্রতিপক্ষ যদি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাহলে নিজেরাও পিছিয়ে থাকতে পারবে না।ফলে শুরু হয়েছে এক নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এটিকে “এআই অস্ত্র প্রতিযোগিতা” বলছেন।যেখানে প্রতিযোগিতা শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের নয়, বরং তথ্য, অ্যালগরিদম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
আজ যে প্রযুক্তি সৈনিককে সহায়তা করছে, আগামীকাল সেই প্রযুক্তিই হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে।তবে যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যত বাড়ছে, নিরাপত্তার পাশাপাশি নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং মানবিকতার প্রশ্নও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


