ডেস্ক: বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বলা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে বহু ইতিবাচক পদক্ষেপ হয়েছে।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তে “পুশ-ইন” , সীমান্তে উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক বক্তব্য সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন এক পরীক্ষার মুখে।
প্রশ্ন হলো, এটি কি সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনা, নাকি দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত?
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। সে সময় ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্ককে “মৈত্রীর সম্পর্ক” বলা হলেও, সব সময় সেই সম্পর্ক এক রকম ছিল না।
বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন, অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য বৈষম্য, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ এসব বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তবে ২০০৯ সালের পর নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিদ্যুৎ বাণিজ্য, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
কিন্তু ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের মধ্যে আগের মতো রাজনৈতিক আস্থা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
এর মধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় “পুশ-ইন” অভিযোগ।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ করা হয়েছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কিছু ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করেছে।
অন্যদিকে ভারতের দাবি, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাদের অনেকেই অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করছিলেন এবং তারা বাংলাদেশের নাগরিক।
এখানেই তৈরি হয়েছে কূটনৈতিক জটিলতা।
কারণ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানোর আগে তার জাতীয়তা যাচাই এবং দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমন্বয় হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না হলে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে পারে।
এদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই ইস্যুকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
বিশেষ করে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।
নির্বাচনের সময় এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফলে সীমান্ত নীতিতেও তার প্রভাব পড়ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বলছে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক আইন এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
ঢাকা বারবার জোর দিয়ে বলছে, যেকোনো নাগরিককে ফেরত পাঠাতে হলে নির্ধারিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
এদিকে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নয়।
ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার।
বিদ্যুৎ আমদানি, রেল যোগাযোগ, সড়কপথ, নৌপথ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামালের একটি অংশও ভারত থেকে আসে।
আবার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব শুধু কূটনীতিতে নয়, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগেও পড়তে পারে।
তবে পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে যাচ্ছে বলেও মনে করছেন না অনেক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
তাদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিয়মিত পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক, সীমান্ত সম্মেলন এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ এখনো সক্রিয় রয়েছে।
অর্থাৎ মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো সীমান্তে ছোট ছোট ঘটনাগুলো দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেক সময় যাচাইবাছাই ছাড়াই বিভিন্ন তথ্য ভাইরাল হওয়ায় দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভুল বোঝাবুঝি বাড়ছে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা দায়িত্বশীল তথ্য প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, প্রতিবেশী বদলানো যায় না, কিন্তু সম্পর্কের ধরন বদলানো যায়।
তাই দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা ও দিল্লির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিতর্ক নয়, আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ ইতিহাস বলছে, এই দুই দেশের সম্পর্ক যত শক্তিশালী হয়েছে, লাভবান হয়েছে পুরো অঞ্চলই।


