ডেস্ক: পূর্ব এশিয়ার দেশ উত্তর কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোর একটি। বাইরে থেকে পাওয়া সীমিত ছবি ও ভিডিওতে এর শহরগুলোকে আধুনিক, পরিষ্কার আর উন্নত মনে হলেও, ভেতরের বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী পিয়ংইয়ং,ওনসান-কালমা,সামজিয়ন যেখানে প্রশস্ত রাস্তা, উঁচু ভবন আর আলোকসজ্জা দেখা যায় সেই শহরের ভেতরে আসলে কী চলছে?এই আধুনিকতার চিত্র কতটা বাস্তব?
উত্তর কোরিয়ার রহস্যময় শহরগুলো বিশেষ করে রাজধানী পিয়ংইয়ং, সামজিয়ন বা ওনসান-কালমা বাইরে থেকে যতটা আধুনিক, চকচকে এবং সুউচ্চ ভবনে ঠাসা মনে হয়, তার পেছনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিম জং উনের শাসনামলে এই শহরগুলো “সোশ্যালিস্ট ইউটোপিয়া” হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যা আসলে এক ধরনের প্রোপাগান্ডা ।
পিয়ংইয়ংকে অনেকেই “শোকেস সিটি” বলে থাকেন।
অর্থাৎ, দেশের এমন একটি শহর যা বাইরের বিশ্বের সামনে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এখানে বসবাসের সুযোগও সীমিত মূলত সরকারের প্রতি অনুগত এবং নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির মানুষদেরই এখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।মিরার সায়েন্টিস্ট স্ট্রিট বা রিওমিয়ং স্ট্রিটের মতো এলাকায় উজ্জ্বল রঙের বহুতল ভবন এবং আধুনিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এই ফ্ল্যাটগুলো সাধারণ মানুষের জন্য নয়। এছাড়া, নতুন ভবনগুলোতে লোডশেডিং সাধারণ ঘটনা এবং অনেক সময় লিফট বা পানির সংযোগ সচল থাকে না। রাতের বেলা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য অনেক ভবনে আলো জ্বালানো নিষিদ্ধ থাকে।
উত্তর কোরিয়া সামজিয়নকে “আধুনিক সভ্যতার প্রতীক” বলে দাবি করে, যা কিম জং উনের অন্যতম বড় নির্মাণ প্রকল্প। এটি একটি পাহাড়ি আধুনিক শহর, যেখানে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট, স্কি রিসোর্ট এবং কালচারাল সেন্টার রয়েছে।
কিন্তু এই শহর নির্মাণে ‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে সাধারণ মানুষকে তাদের পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করে নতুন এলাকায় নেওয়া হয়েছে, যেখানে বয়স্করা নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে চরম মানসিক ও শারীরিক কষ্টে ভুগছেন।
উত্তর কোরিয়ার ৎওনসান-কালমা উপকূলীয় পর্যটন এলাকাটি ২০২৫ সালের জুলাই মাসে উদ্বোধন করা হয়েছে। এটি একটি বিশাল সমুদ্রসৈকত রিসোর্ট, যা ২০,০০০ দর্শক ধারণ করতে পারে। উদ্বোধনের পর থেকে এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো বিদেশি পর্যটক নেই, মূলত রুশ পর্যটকদের জন্য এটি খোলা হয়েছে। এটি অনেকটা প্রদর্শনী মূলক রিসোর্ট, যেখানে দর্শনার্থী না থাকায় অনেকটা জনমানবহীন।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত উত্তর কোরিয়ার কিজং-দং নামে পরিচিত এলাকাটি পুরোপুরি একটি প্রোপাগান্ডা শহর।
বাইরে থেকে দেখতে একটি সম্পূর্ণ নির্মিত একটি শহর মনে হলেও, এটি আসলে একটি “ঘোস্ট টাউন”। ভবনগুলোর ভেতরে আসল কোনো রুম বা আসবাবপত্র নেই, জানালাগুলো কেবল পেইন্ট করা।
উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বে বর্তমানে রয়েছে আছেন কিম জং উন। তার নেতৃত্বে রাজধানীতে বেশ কিছু বড় নির্মাণ প্রকল্প দেখা গেছে।নতুন আবাসিক ভবন, বিনোদন কেন্দ্র, এমনকি আধুনিক হাসপাতালও নির্মাণ করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রীয় প্রচারে দেখা যায়।তবে বাস্তবতা নিয়ে ভিন্ন তথ্যও সামনে আসে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা Human Rights Watch এর মতে, উত্তর কোরিয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
চলাচল, তথ্যপ্রাপ্তি, এমনকি বাসস্থান সবকিছুই সরকারের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল।পিয়ংইয়ংয়ের বাইরের শহর ও গ্রামগুলোর অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন।
বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত,খাদ্য সংকটের অভিযোগ রয়েছে,এবং অবকাঠামো উন্নয়ন তুলনামূলকভাবে কম।
অর্থাৎ, রাজধানী এবং অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈষম্য রয়েছে।
এছাড়া শহরের ভেতরের কিছু বিষয়ও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কিছু বিশ্লেষণে বলা হয়,অনেক আবাসিক ভবন সম্পূর্ণভাবে বসবাসযোগ্য নয়,কিছু এলাকা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সময়ের জন্য “প্রেজেন্টেশন” হিসেবে সাজানো হয়,
এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের দেখানোর জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করা থাকে।
World Bank এর কাছে যদিও উত্তর কোরিয়া নিয়ে সরাসরি তথ্য সীমিত, তবে সামগ্রিকভাবে দেশটির অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সীমিত বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিয়েছে,এমন ধারণা বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্য নিয়ন্ত্রণ।
দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ খুব সীমিত,
বিদেশি মিডিয়া প্রায় নিষিদ্ধ,এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারই মূল তথ্যের উৎস।ফলে সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে বাইরের বিশ্বের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্যাটেলাইট ছবি ও কিছু ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ,পিয়ংইয়ংয়ে নতুন নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে,রাস্তাঘাট উন্নয়ন করা হচ্ছে,
এবং কিছু অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ছে।কিন্তু এগুলো পুরো দেশের চিত্র নয়,এমনটাই বলছেন পর্যবেক্ষকরা।
সব মিলিয়ে, উত্তর কোরিয়ার শহরগুলো,বিশেষ করে পিয়ংইয়ং,একটি দ্বৈত বাস্তবতার উদাহরণ।
একদিকে আধুনিকতার প্রদর্শন,
অন্যদিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়,
এই উন্নয়ন কি টেকসই?
নাকি এটি শুধুই একটি প্রদর্শনমূলক চিত্র?
উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত,উত্তর কোরিয়ার শহরগুলোকে বুঝতে হলে শুধু যা দেখা যায় তা নয়,বরং যা দেখা যায় না,সেটাও বিবেচনায় নিতে হয়।


