আরব ভূখণ্ডে মার্কিন 'দাদাগিরি'র অবসান

আরব ভূখণ্ডে মার্কিন ‘দাদাগিরি’র অবসান

ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে পারুক আর না পারুক, এর মধ্যেই যে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেছে, তা হলো, উপসাগরীয় এলাকায় আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ‘দাদাগিরি’ থাকছে না।

ইরানি হামলার পরপরই মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ভাসা-ভাসাভাবে ধারণা মিলছিল। এখন নিউইয়র্ক টাইমস আসল ছবি দেখিয়ে দিয়েছে।

এক প্রতিবেদনে তারা বলেছে, ইরানের হামলায় কমপক্ষে ১৭টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে তাদের অনেক সেনা মারা পড়েছেন। হামলার শিকার হয়েছে একাধিক মার্কিন দূতাবাস।

মার্কিন নিরাপত্তাকে ‘মৌনতার সুতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর’ এবং ‘সেই চাদরের ভাঁজে ভাঁজে নিঃশ্বাসেরই ছোঁয়া…আছে ভালোবাসা-আদর’ ভেবে আরবের বাদশাহরা এত দিন নিশ্চিন্ত আলস্যবিলাসী ঘুম দিচ্ছিলেন।

ইরানি মিসাইলের আওয়াজে ঘুম ভাঙার পর এখন তাঁরা দেখছেন, সেই চাদর ছিঁড়েফুঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেছে।

ইসলামাবাদের সালিসি টেবিলে যুদ্ধবিরতির জন্য ইরান যে ১০টি শর্ত রেখেছিল, তার মধ্যে একটি হলো এই অঞ্চল থেকে যুদ্ধকালে মোতায়েন করা সব মার্কিন সেনা সরিয়ে নিতে হবে।

ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি না করলেও ইতিমধ্যে আমেরিকাকে জানিয়ে দিয়েছে, সেখানে কোনো মার্কিন ঘাঁটি রাখা যাবে না। অর্থাৎ ঘটিবাটি ফেলে আফগানিস্তানের বাগরাম ঘাঁটি ছেড়ে মার্কিন সেনারা যেভাবে চলে গিয়েছিল, সেভাবে উপসাগরীয় এলাকা থেকে তাদের ভাগতে হবে।

প্রশ্ন হলো, আরবের বাদশাহরা কেন তাঁদের দেশের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রকে এত ঘাঁটি বানানোর অনুমতি দিয়েছিলেন? এসব ঘাঁটি কার নিরাপত্তার জন্য বানানো হয়েছিল? এগুলো কি আসলে বাদশাহ-আমিরদের গদির, নাকি আরবের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বানানো হয়েছে? নাকি এগুলোর কাজ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের নিরাপত্তা দেওয়া? নাকি এর পেছনে আরও কারণ আছে?

ধান ভানতে শিবের গীতের মতো শোনালেও এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার এবং পরিষ্কারভাবে গোটা ছবিকে মাথার মধ্যে নেওয়ার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পেছনে।

১. বর্তমান প্রেক্ষাপট:

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বা ‘দাদাগিরি’ এখন খাদের কিনারে। ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় ১৭টি মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট বলছে, মার্কিন নিরাপত্তাকে যারা ‘অভেদ্য চাদর’ ভেবেছিলেন, সেই আরব বাদশাহদের ঘুম এখন ভেঙে গেছে।

২. ঐতিহাসিক সূত্র (বনু হানিফা ও সৌদি বংশ):

এই সংকটের মূল বুঝতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১,৩০০ বছর আগে। ইয়ামামার যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর হাতে পরাজিত বনু হানিফা গোত্র থেকে ১৭২৭ সালে উত্থান ঘটে মুহাম্মদ বিন সৌদের। পরে ১৭৪৪ সালে ধর্মীয় নেতা আবদুল ওয়াহাবের সাথে ‘দিরিয়াহ চুক্তির’ মাধ্যমে আজকের সৌদি রাজত্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

৩. ব্রিটিশদের ধোঁকা ও হাশেমি বংশের পতন:

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা অটোমান সাম্রাজ্য ভাঙতে মক্কার শরিফ হুসেইনকে ‘স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের’ লোভ দেখায়। কিন্তু গোপনে ‘সাইকস-পিকো’ চুক্তির মাধ্যমে আরব ভাগ করে নেয় এবং ‘ব্যালফোর ঘোষণার’ মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের বীজ বোনে। প্রতিশ্রুতি না রাখায় শরিফ হুসেইন ক্ষুব্ধ হলে ব্রিটিশরা সমর্থন সরিয়ে নেয় এবং ১৯২৬ সালে আবদুলআজিজ বিন সৌদ মক্কা-মদিনা দখল করে ‘সৌদি আরব’ প্রতিষ্ঠা করেন।

৪. মার্কিন ঘাঁটির অনুপ্রবেশ (সাদ্দাম হোসেন ইস্যু):

বাদশাহ ফয়সাল ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও তাঁর মৃত্যুর পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলের ভয় দেখিয়ে (কিছুটা সত্য, কিছুটা বানোয়াট স্যাটেলাইট ছবি) যুক্তরাষ্ট্র আরব বাদশাহদের রাজি করায় তাদের ভূখণ্ডে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গাড়তে। যা মূলত বাদশাহদের গদি রক্ষা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

৫. বর্তমান সংকট ও পরিণতি:

আফগানিস্তানের বাগরাম ঘাঁটি ছেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখন উপসাগরীয় অঞ্চলেও তৈরি হয়েছে। ইরানের হাইপারসনিক মিসাইল মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করে দিচ্ছে। কাতার, কুয়েত ও আমিরাতের ঘাঁটিগুলো এখন আর নিরাপদ নয়।

আরব দেশগুলো অস্ত্র কেনায় বিলিয়ন ডলার খরচ করলেও সামরিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র এবং ভূ-রাজনীতি এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।

আরো খবর ➔
Discovering the Theme Nights at Golden Star Casino Australia