বিদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে ‘অদৃশ্য লয়্যালটি’ কাকে অনুসরণ করছে কমিউনিটি?

বিদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে ‘অদৃশ্য লয়্যালটি’ কাকে অনুসরণ করছে কমিউনিটি?

ডেস্ক: বিদেশে বাংলাদেশি কমিউনিটি মানেই পারস্পরিক সহায়তা, একসাথে টিকে থাকার চেষ্টা। কিন্তু এই সম্পর্কের ভেতরেই অনেক সময় তৈরি হয় এক ধরনের “অদৃশ্য লয়্যালটি”।যেখানে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গ্রুপ বা প্রভাবশালীদের প্রতি নীরব আনুগত্য কাজ করে। বিষয়টি এখন অনেক দেশের প্রবাসী কমিউনিটিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে এই প্রবণতা কম-বেশি দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কমিউনিটির সদস্যরা। তাদের মতে, অনেক সিদ্ধান্তে সবাই নিজের মত প্রকাশ করেন না। বরং আগে থেকেই বোঝা যায় কারা কাকে সমর্থন করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই “অদৃশ্য লয়্যালটি” তৈরি হয় মূলত সুবিধা, সম্পর্ক, নির্ভরতা এবং কখনো কখনো চাপে।।

প্রথমত, সুবিধা বা সুযোগের বিষয়। প্রবাসে নতুন কেউ গেলে কাজ, বাসা বা ব্যবসার সুযোগ পেতে হয় পরিচিতদের মাধ্যমে। যারা আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে সুবিধা পাওয়া সহজ,এই ধারণা থেকেই অনেকেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য দেখান। ফলে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে তারা একই দিকেই অবস্থান নেন।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক সম্পর্ক। একই জেলা, এলাকা বা আত্মীয়তার বন্ধনে অনেক সময় ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয়। এই গ্রুপের ভেতরে এক ধরনের বিশ্বাস থাকে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে কেউ ভিন্ন মত দিলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই অনেকেই নিজের মত লুকিয়ে রাখেন।

তৃতীয়ত, তথ্যের ওপর নির্ভরতা। প্রবাসে চাকরি, ভিসা, কাগজপত্র এসব তথ্য সবসময় সহজে পাওয়া যায় না। কিছু নির্দিষ্ট মানুষ বা গ্রুপ এই তথ্য সরবরাহ করেন। ফলে তারা এক ধরনের “কেন্দ্র” হয়ে ওঠেন। যারা তাদের কাছ থেকে সাহায্য পান, তারা স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতি অনুগত হয়ে পড়েন।।

Pew Research Center এর মতে, যেকোনো কমিউনিটিতে মানুষ সাধারণত সেই দিকেই ঝোঁকে, যেখানে তারা নিরাপত্তা বা সুবিধা পায়। এতে ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য আনুগত্য তৈরি হয়।

চতুর্থত, সামাজিক চাপ বা ভয়। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে—ভিন্ন মত দিলে কাজের সুযোগ কমে যেতে পারে, বা কমিউনিটির ভেতরে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাই অনেকেই চুপ থাকেন এবং নির্দিষ্ট পক্ষকে নীরবে সমর্থন দেন।

কমিউনিটি সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি দেখা যায়। বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশন, ক্লাব বা সংগঠনে নির্বাচন বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অনেকেই খোলাখুলি মত দেন না। বরং আগে থেকেই একটি “লাইন” ধরে চলেন। এতে করে নেতৃত্ব পরিবর্তন বা নতুন মতামত আসা কঠিন হয়ে পড়ে।

Transparency International বলছে, যেকোনো সংগঠনে যদি সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া খোলামেলা না হয়, তাহলে অল্প কয়েকজনের প্রভাব বাড়ে এবং অন্যরা নীরবে অনুসরণ করতে শুরু করে।

তবে এই অদৃশ্য লয়্যালিটির ইতিবাচক দিকও আছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সম্পর্কই কমিউনিটিকে একসাথে রাখে। বিপদে সাহায্য, নতুনদের গাইড করা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এসব ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই আনুগত্য ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার হয় বা অন্যদের সুযোগ কমিয়ে দেয়। এতে কমিউনিটির ভেতরে বিভাজন তৈরি হতে পারে।।

অনেক প্রবাসী এখন এই বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলছেন। তারা চাইছেন,
সবাই যেন নিজের মত দিতে পারে,
সিদ্ধান্তগুলো খোলামেলা হয়,
এবং তথ্য সবার জন্য সহজলভ্য থাকে।

সব মিলিয়ে, বিদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে “অদৃশ্য লয়্যালটি” একটি বাস্তব বিষয়। এটি একদিকে সম্পর্কের শক্তি, অন্যদিকে স্বচ্ছতার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকে যায়, এই আনুগত্য কি কমিউনিটিকে শক্তিশালী করছে, নাকি সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে?
উত্তর নির্ভর করছে,এটি কতটা ন্যায্য, কতটা খোলামেলা, আর কতটা সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করছে তার ওপর।

আরো খবর ➔
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ বাজার বেড়েছে:বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের ভূমিকা কী?