ভারতের শহরগুলোতে পানি ট্যাংকারের কালোবাজার সংকটের সুযোগে বাড়ছে পানির ব্যবসা

ভারতের শহরগুলোতে পানি ট্যাংকারের কালোবাজার সংকটের সুযোগে বাড়ছে পানির ব্যবসা

ডেস্ক: এক সময় পানি ছিল মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য সম্পদ। কিন্তু এখন ভারতের অনেক বড় শহরে সেই পানিই হয়ে উঠেছে দামী পণ্য। যেখানে কল খুললেই পানি পাওয়ার কথা, সেখানে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন একটি পানি ট্যাংকারের জন্য। আর এই সংকটের সুযোগে গড়ে উঠছে কোটি কোটি টাকার পানি ব্যবসা। অনেক জায়গায় অভিযোগ উঠছে, সরকারি পানির সরবরাহ কমে গেলেই বেসরকারি ট্যাংকারের চাহিদা বাড়ে, আর সেই সুযোগে ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানো হয়।

প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি শুধু প্রকৃতির কারণে, নাকি এর পেছনে রয়েছে বড় একটি ব্যবসায়িক চক্র?

ভারতের রাজধানী দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ এবং পুনের মতো বড় শহরগুলোতে প্রতি গরম মৌসুমেই পানির সংকট দেখা যায়। কোথাও ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, কোথাও বৃষ্টির পরিমাণ কম, আবার কোথাও দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা। ফলে সরকারি পানি সরবরাহ অনেক এলাকায় চাহিদার তুলনায় কম পড়ছে।

এই সুযোগেই বাড়ছে বেসরকারি পানি ট্যাংকারের ব্যবসা।

অনেক এলাকায় দেখা যায়, দিনে একবারও সরকারি পানি আসে না। তখন মানুষ বাধ্য হয়ে ট্যাংকার ডেকে পানি কিনছেন। আগে যে ট্যাংকারের জন্য এক হাজার থেকে দেড় হাজার রুপি লাগত, সংকটের সময় সেই একই ট্যাংকারের দাম দুই হাজার, তিন হাজার, এমনকি তারও বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে বেঙ্গালুরুতে চলতি বছরের পানি সংকটের সময় এমন অভিযোগ সবচেয়ে বেশি সামনে আসে। অনেক পরিবার জানিয়েছে, শুধু পানি কিনতেই তাদের মাসে কয়েক হাজার রুপি অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।

ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, অনেক জায়গায় অনুমতি ছাড়া ভূগর্ভ থেকে পানি তুলে ট্যাংকারে করে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ব্যবসা বাড়ছে, অন্যদিকে আরও দ্রুত কমে যাচ্ছে ভূগর্ভের পানির স্তর।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিছু এলাকায় সরকারি পানি এলেও তা সব বাড়িতে ঠিকমতো পৌঁছায় না। পরে একই এলাকার মানুষকে আবার ট্যাংকার থেকে বেশি দামে পানি কিনতে হয়।

তবে সব ট্যাংকার ব্যবসায়ী যে নিয়ম ভাঙছেন, এমন নয়।

অনেক বৈধ ব্যবসায়ী বলছেন, জ্বালানির দাম, গাড়ির খরচ এবং পানির উৎস দূরে হওয়ার কারণে তাদেরও খরচ বেড়েছে। তাই সব দোষ ট্যাংকার মালিকদের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি রাজ্য সরকার অভিযানও চালিয়েছে। কোথাও অবৈধভাবে পানি তোলার অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে, আবার কোথাও অবৈধ ট্যাংকার জব্দ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালালেই সমস্যার সমাধান হবে না।
যতদিন শহরে পানির চাহিদা বাড়বে আর সরবরাহ কম থাকবে, ততদিন এই ব্যবসাও চলবে।

তাদের মতে, নতুন জলাধার তৈরি, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, পুরোনো পাইপলাইন ঠিক করা এবং পানির অপচয় কমানো এসব কাজ একসঙ্গে করতে হবে।

পরিবেশবিদদের আরেকটি বড় চিন্তা হলো, ভূগর্ভ থেকে অতিরিক্ত পানি তোলা।

বছরের পর বছর এভাবে পানি তুলতে থাকলে ভবিষ্যতে অনেক এলাকায় পানির স্তর আরও নিচে নেমে যেতে পারে। তখন শুধু গরমের সময় নয়, সারা বছরই পানির সংকট দেখা দিতে পারে।

এই সমস্যার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পড়ছে।

অনেক পরিবারকে প্রতিদিন পানি ব্যবহারে হিসাব করে চলতে হচ্ছে। কোথাও কাপড় ধোয়া কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার কয়েকটি পরিবার মিলে একটি ট্যাংকারের পানি ভাগ করে ব্যবহার করছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতের অনেক শহরে পানির সংকট এখন শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই সংকটের সুযোগে কিছু অসাধু চক্র বেশি লাভ করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ দিনদিন‌ই বাড়ছে।

আরো খবর ➔
ডার্ক ওয়েবের গোপন বাজার: টাকা দিলেই কী পাওয়া যায় এই অদৃশ্য জগতে?