আমেরিকান স্পাইওয়্যারকে বিদায় দিল ফ্রান্স: তবে কি মার্কিন আধিপত্যের পতন শুরু?

আমেরিকান স্পাইওয়্যারকে বিদায় দিল ফ্রান্স: তবে কি মার্কিন আধিপত্যের পতন শুরু?

ডেস্ক: প্রযুক্তির এই যুগে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, ডেটার ভেতরেও চলছে। একসময় যে দেশ সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকত, আজ সেই দেশ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে। আর ঠিক এই সময়েই ইউরোপ থেকে এলো এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা শুধু একটি সফটওয়্যার পরিবর্তনের খবর নয়; বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি-ভূরাজনীতির নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএসআই ঘোষণা দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির-এর সফটওয়্যার ধীরে ধীরে বাদ দিয়ে ফরাসি প্রতিষ্ঠান শ্যাপসভিশন-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। এই সিদ্ধান্তকে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

প্যালান্টির কোনো সাধারণ সফটওয়্যার কোম্পানি নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনী এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা তৈরি করে। সন্ত্রাসবাদ দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এসব ক্ষেত্রেও তাদের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বহু বছর ধরেই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নজরদারি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রেও রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফ্রান্স হঠাৎ করে এই সফটওয়্যার বদলানোর সিদ্ধান্ত নিল কেন?
ফরাসি সরকারের বক্তব্য, বিষয়টি শুধু সফটওয়্যার নয়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত।

প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,ফ্রান্স আর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে কোনো ‘কৌশলগত নির্ভরতা’ বা ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিপেন্ডেন্সি’ সহ্য করতে পারে না। তাই নিজেদের প্রযুক্তি নিজেদের হাতেই রাখতে হবে।এই বক্তব্যের পেছনেও রয়েছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কিছু উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের প্রবেশাধিকার বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য সীমিত করে। এর পর থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে ,যদি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজ পুরোপুরি বিদেশি সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংকটের সময় কী হবে?

শুধু প্যালান্টির নয়, ফ্রান্স ইতোমধ্যেই সরকারি দপ্তরে মাইক্রোসফট টিমস এবং জুম-এর পরিবর্তে নিজেদের তৈরি ভিজিও প্ল্যাটফর্ম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সরকারি কাজে দেশীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান মিস্ত্রাল এআই-এর প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও নিয়েছে।

এতে বোঝা যাচ্ছে, এটি একক কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং ফ্রান্সের বৃহত্তর “ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব” কৌশলের অংশ।

শুধু ফ্রান্স নয়, ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশও তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে। কারণ অনেক ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ ডেটা যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে তা রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

তবে এর মানে এই নয় যে আমেরিকার প্রযুক্তি শিল্প ভেঙে পড়ছে।

বাস্তবতা হলো, আজও বিশ্বের ক্লাউড সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অপারেটিং সিস্টেম এবং তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই রয়েছে।

অর্থাৎ ফ্রান্সের এই সিদ্ধান্তকে এখনই “মার্কিন আধিপত্যের পতন” বলা অতিরঞ্জিত হবে।

বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি বড় কর্মকান্ডের সূচনা হতে পারে, যেখানে বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তা-সংবেদনশীল খাতে নিজেদের প্রযুক্তি তৈরি করতে চাইবে।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও সহজ হবে না।

ফ্রান্স নিজেই জানিয়েছে, প্যালান্টির থেকে নতুন ব্যবস্থায় পুরোপুরি যেতে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। কারণ শুধু সফটওয়্যার বদলালেই হয় না; নতুন অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা পরীক্ষাও করতে হয়।

তবুও এই ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক প্রযুক্তি-ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন।একসময় দেশগুলো তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইত। এখন তারা কমাতে চাইছে ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর বিদেশি নির্ভরতা।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, আগামী দিনের বিশ্বে শুধু সেনাবাহিনী বা অর্থনীতি নয়, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণও হবে শক্তির অন্যতম বড় উৎস। আর তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু “কে সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি বানাচ্ছে”তা নয়; বরং “কে নিজের প্রযুক্তির ওপর নিজেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে”সেটিই ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হয়ে উঠতে পারে।

আরো খবর ➔
জরুরি কারণ ছাড়া বের হলেই কঠোর শাস্তি