মেসিপ্রেম বনাম ভূরাজনীতি: আর্জেন্টিনা যে ইসরায়েলের বন্ধু, বাংলাদেশিরা কি জানে?

ডেস্ক: বাংলাদেশে ফুটবল মানেই এক অদ্ভুত আবেগ। বিশ্বকাপ এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় উড়তে থাকে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। বিশেষ করে লিওনেল মেসিকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা এখন আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচিত। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন পর্যন্ত বহুবার বাংলাদেশের এই সমর্থনের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে।

কিন্তু এই আবেগের মাঝেই একটি প্রশ্ন মাঝে মাঝে সামনে আসে।যে দেশকে বাংলাদেশের লাখো মানুষ নিঃশর্তভাবে সমর্থন করে, সেই আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তারা কতটা জানেন?বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে কি সাধারণ ফুটবল সমর্থকদের কোনো ধারণা আছে?

আর্জেন্টিনা এবং ইসরায়েলের মধ্যে বহু দশকের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, কৃষি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা গড়ে উঠেছে।বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও বেড়েছে।

২০২৪ সালে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি ইসরায়েল সফর করেন, জেরুজালেমে প্রার্থনা করেন এবং ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের ইচ্ছার কথাও জানান।

এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।তবে এখানেই আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতি এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।লিওনেল মেসি বা আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রা দেশের সরকারি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করেন না।একজন ফুটবলারের জনপ্রিয়তা এবং একটি দেশের কূটনৈতিক অবস্থান এক জিনিস নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে স্পষ্ট।বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।জাতিসংঘে বিভিন্ন ভোট, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং কূটনৈতিক বিবৃতিতে বাংলাদেশ বারবার দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।গাজায় সাম্প্রতিক সংঘাতের সময়ও বাংলাদেশ সরকার ফিলিস্তিনের বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং মানবিক সহায়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে বাংলাদেশে একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন এবং আর্জেন্টিনার প্রতি এত ভালোবাসা কেন?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, খেলাধুলার আবেগ এবং রাজনৈতিক বিশ্বাস মানুষের মনে আলাদা দুটি জায়গায় কাজ করে।কেউ একটি দেশের ফুটবল দলকে সমর্থন করলেই সেই দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন এমনটি নয়।বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার বড় কারণ লিওনেল মেসি।তার খেলার ধরণ, দীর্ঘ সংগ্রাম, বিশ্বকাপ জয় এবং ব্যক্তিগত অর্জন কোটি মানুষের মনে আবেগ তৈরি করেছে।

এই আবেগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সরাসরি সম্পর্ক নেই।একই ধরনের উদাহরণ বিশ্বের আরও অনেক দেশেই দেখা যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেও ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে, যদিও সেই দেশগুলোর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে্র আবার যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মানুষ জাপানি সংস্কৃতি ভালোবাসেন, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

অর্থাৎ সংস্কৃতি, খেলাধুলা এবং কূটনীতি অনেক সময় আলাদা পথে চলে।তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই বিষয়গুলো প্রায়ই একসঙ্গে মিশে যায়।ফলে অনেক সময় ফুটবল নিয়ে আবেগের মধ্যেও ভূরাজনীতি ঢুকে পড়ে।আবার রাজনৈতিক বিতর্কেও খেলাধুলাকে টেনে আনা হয়।এতে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।

আরেকটি বিষয় হলো, আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিও সব সময় একই রকম ছিল না।
বিভিন্ন সরকারের সময় বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রাধিকারও বদলাতে পারে।তাই একটি নির্দিষ্ট সময়ের নীতিকে পুরো দেশের স্থায়ী পরিচয় হিসেবে দেখাও পুরোপুরি সঠিক নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের মানুষের আর্জেন্টিনাপ্রেম মূলত ফুটবলকেন্দ্রিক।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন এসেছে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতি, মানবিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। দুটি বিষয়ের ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, খেলাধুলা মানুষকে এক করে, আর ভূরাজনীতি অনেক সময় বিভক্ত করে।
তাই একটি দেশের জার্সিকে ভালোবাসা আর সেই দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা,দুই বিষয় কখনোই এক নয়।

সম্ভবত এ কারণেই বাংলাদেশের মানুষ একদিকে মেসির জাদুতে মুগ্ধ হন, আবার অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের মানবিক ও রাজনৈতিক অবস্থানও ধরে রাখেন।

আরো খবর ➔
চাকরি হারিয়ে ১৪ বছর পর পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়লেন সাবেক মেটা কর্মী ভাইরাল হলো হৃদয়বিদারক