ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া কিংবা উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত বহু প্রবাসী বাংলাদেশি এখন ধীরে ধীরে ঝুঁকছেন ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে।
অভিযোগ উঠছে, দেশি ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে বিকল্প ডিজিটাল মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।যার একটি বড় অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘুরছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা Chainalysis,এর সাম্প্রতিক গ্লোবাল ক্রিপ্টো অ্যাডপশন রিপোর্টে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রিপ্টো ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ নয়,এমন সতর্কবার্তা একাধিকবার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনের সুযোগ এবং বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সহজলভ্যতা অনেককে এর উপর ঝুঁকছেন ।
Bangladesh Financial Intelligence Unit অতীতে একাধিক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভার্চুয়াল অ্যাসেট বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে অর্থ পাচারের ঝুঁকি রয়েছে।
একইভাবে Financial Action Task Force, এর বিভিন্ন রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণহীন বা কম নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল সম্পদ সীমান্তপারের অবৈধ অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত হতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে,কেন প্রবাসীদের একটি অংশ প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির দিকে ঝুঁকছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে ফি, বিনিময় হার ও প্রক্রিয়াগত সময় নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
অনেক প্রবাসী দাবি করেন, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠালে প্রক্রিয়া তুলনামূলক ধীর এবং কখনও কখনও জটিল কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়।
দ্বিতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল ওয়ালেট ও ক্রিপ্টো ব্যবহার বাড়ছে।
World Bankএর রেমিট্যান্স বিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৈশ্বিকভাবে রেমিট্যান্স খরচ কমাতে ডিজিটাল মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে একই সঙ্গে ঝুঁকির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটি আর্থিক বিশ্লেষণ রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, কিছু প্রবাসী ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছেন দ্রুত লেনদেন এবং তুলনামূলক গোপনীয়তার কারণে। কারণ ব্লকচেইন প্রযুক্তি লেনদেনের রেকর্ড রাখলেও ব্যবহারকারীর পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি প্রকাশিত হয় না,বিশেষ করে যদি নিয়ন্ত্রিত এক্সচেঞ্জের বাইরে লেনদেন করা হয়।
তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। International Monetary Fund এর একাধিক নীতিগত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণবিহীন ক্রিপ্টো লেনদেন আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একইভাবে APG সতর্ক করেছে, ভার্চুয়াল অ্যাসেট সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ না করা হলে তা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৭ সাল থেকেই ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুনরায় সতর্ক করেছে, অনুমোদনহীন ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহার করলে আইনগত ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।
তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা হলো,ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিপ্টোকারেন্সি পুরোপুরি উপেক্ষা করা কঠিন।
বিশ্বের অনেক দেশ এখন নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করছে, সরাসরি নিষেধাজ্ঞার বদলে নজরদারি বাড়াচ্ছে।
প্রবাসীদের একটি অংশের যুক্তি, তারা বৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ দ্রুত এবং কম খরচে দেশে পাঠাতে চান।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ,এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন অবৈধ অর্থ পাচার না করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি এখন দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত লেনদেনের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়,প্রবাসীদের ক্রিপ্টো ঝোঁক কি কেবল সুবিধা ও প্রযুক্তির কারণে, নাকি এর আড়ালে গড়ে উঠছে বিকল্প এক আর্থিক প্রবাহ, যা দেশি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকেই পরিচালিত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সতর্কবার্তা ও বাড়তে থাকা ডিজিটাল লেনদেনের পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে,প্রবাসী অর্থপ্রবাহের ভবিষ্যৎ হয়তো দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এবং সেই পরিবর্তন নজরদারির বাইরে থাকলে তা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


