বাংলাদেশি অর্থ পাচারকারীদের গোপন ঠিকানা ফাঁস করছে ডার্ক ওয়েব

বাংলাদেশি অর্থ পাচারকারীদের গোপন ঠিকানা ফাঁস করছে ডার্ক ওয়েব

ডেস্ক: কানাডার টরন্টোর কাছেই গড়ে ওঠা তথাকথিত ‘বেগম পাড়া’ আর মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসবহুল আবাসিক দ্বীপ দুবাইয়ের ‘পাম জুমেইরাহ’,এদুটি নামই এখন বাংলাদেশি অর্থ পাচারের আলোচনায় নতুন করে সামনে চলে এসেছে।

আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান, বিভিন্ন আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট এবং সম্প্রতি ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়া কিছু নথি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে এসব অভিজাত এলাকায়।

আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন OCCRP , কানাডার আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা FINTRAC, এবং দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা Transparency International এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে আগেও উঠে এসেছে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়টি। যদিও সেসব প্রতিবেদনে নির্দিষ্টভাবে সব নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট,এই অর্থ পাচারের পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত একটি নেটওয়ার্ক।

ডার্ক ওয়েবে সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া কিছু ডেটা ফাঁসের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে কানাডার ‘বেগম পাড়া’।

অভিযোগ অনুযায়ী, টরন্টোর আশপাশের এই এলাকায় বহু বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে বাংলাদেশি নাগরিকদের নামে। যাদের অনেকেই বাংলাদেশে থাকাকালীন সরকারি, আধা-সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে বা প্রভাবশালী ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

অনুসন্ধানকারীদের দাবি, এসব সম্পদের সঙ্গে ঘোষিত বৈধ আয়ের কোনো বাস্তবসম্মত মিল পাওয়া যায় না।

একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে দুবাইয়ের ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত পাম জুমেইরাহতে।

আন্তর্জাতিক সম্পত্তি বাজার ও দুবাইয়ের ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত ডেটা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখানে থাকা বহু ভিলা ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রকৃত মালিকানা সরাসরি প্রকাশ্যে নেই।

ডার্ক ওয়েবে পাওয়া তথ্যে দাবি করা হচ্ছে, এসব সম্পদের একটি অংশ বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে যুক্ত, যাদের আয় ও সম্পদের উৎস সন্দেহজনক বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থ পাচারের প্রক্রিয়া অত্যন্ত পরিকল্পিত।

FATFএর বিভিন্ন মূল্যায়ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে ভুয়া কোম্পানি, ট্রেড মিসইনভয়েসিং, হুন্ডি, বিদেশে আত্মীয় বা শেল কোম্পানির নামে সম্পদ কেনা এই পদ্ধতিগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকির বাইরে নয়।

ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে ব্যাংক ট্রান্সফার রেকর্ড, সম্পত্তির ডকুমেন্টের অংশবিশেষ এবং মধ্যস্থতাকারীদের যোগাযোগের তথ্য থাকার দাবি করা হয়েছে।

যদিও এসব তথ্যের পূর্ণ সত্যতা যাচাই এখনও চলমান, তবুও আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নতুন করে আলোড়ন তুলেছে।
জানা গেছে, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এখন এসব তথ্য খতিয়ে দেখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের BFIU এর সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, একবার অর্থ বিদেশে চলে গেলে তা ফেরত আনা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে। কারণ একাধিক দেশের আইন, গোপনীয়তা বিধি এবং প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা তদন্তকে ধীর করে দেয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের অর্থ পাচার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হয়। সাধারণ মানুষের করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হলেও, সেই অর্থের সুবিধা ভোগ করে একটি সীমিত গোষ্ঠী।

সরকারের দায়িত্বশীল মহল দাবি করছে, অর্থ পাচার রোধে আইন সংশোধন, ব্যাংকিং নজরদারি জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে।

তবে বাস্তবতা হলো, ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হওয়া এই তথ্যগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থায় রূপ নেয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘বেগম পাড়া’ বা ‘পাম জুমেইরাহ’ এখন আর শুধু জায়গার নাম নয়,এগুলো বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছে।

এখন প্রশ্ন একটাই, এই গোপন ঠিকানাগুলো কি আদৌ আর গোপন থাকবে, নাকি আন্তর্জাতিক চাপ ও অনুসন্ধানে একদিন প্রকাশ্যে আসবে সব হিসাব।

আরো খবর ➔
নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস