ভারতের ‘ব্রেন ড্রেন’ থেকে ‘ওয়েলথ ড্রেন’

ডেস্ক: এক সময় বলা হতো, ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে “ব্রেন ড্রেন” অর্থাৎ দেশের সেরা শিক্ষার্থী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং প্রকৌশলীরা উন্নত সুযোগের খোঁজে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন সেই আলোচনায় যোগ হয়েছে আরেকটি নতুন শব্দ।তা হলো “ওয়েলথ ড্রেন”। অর্থাৎ শুধু মেধাবীরাই নন, দেশের ধনী ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিরাও একের পর এক ভারত ছেড়ে বিদেশে স্থায়ী হচ্ছেন।

তাহলে প্রশ্ন হলো, বিশ্বের অন্যতম দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশ ভারত থেকে কেন একই সঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছে মেধা এবং সম্পদ? এটি কি সাময়িক পরিস্থিতি, নাকি ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা?

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরামর্শ প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স এবং বৈশ্বিক সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ ওয়ার্ল্ড ওয়েলথ এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ভারত থেকে হাজার হাজার সম্পদশালী ব্যক্তি বিদেশে চলে গেছেন। শুধু ২০২৩ সালে প্রায় ৫ হাজার ১০০ জন মিলিয়নেয়ার ভারত ছেড়েছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জনের কাছাকাছি বলে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। তাদের অনেকেই সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং পর্তুগালে বসবাস শুরু করেছেন।

এদিকে শুধু ধনীরাই নন, ভারতের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাও এখনো শক্তিশালী।

ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর লাখ লাখ ভারতীয় শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মানি এখনো তাদের প্রধান গন্তব্য। অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ নিচ্ছেন।

বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গবেষণা এবং প্রকৌশল খাতের দক্ষ কর্মীদের বিদেশে চাহিদা অনেক বেশি।

কিন্তু কেন এই প্রবণতা?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।

প্রথমত, উন্নত জীবনযাত্রা এবং উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা।

দ্বিতীয়ত, বিদেশে উচ্চ আয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সুযোগ।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কর-সংক্রান্ত সুবিধা।

অনেক ধনী পরিবার মনে করছে, বৈশ্বিক ব্যবসা পরিচালনা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য দুবাই বা সিঙ্গাপুরের মতো শহর এখন বেশি সুবিধাজনক।

অন্যদিকে মেধাবী তরুণদের অনেকেই মনে করেন, বিদেশে গবেষণার সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কর্মপরিবেশ তুলনামূলকভাবে উন্নত।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু অর্থনৈতিক কারণই নয়, সামাজিক ও প্রশাসনিক বিষয়ও অনেকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

কিছু ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রক জটিলতা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কথাও উল্লেখ করছেন। আবার অনেক তরুণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্যেই বিদেশে যাওয়াকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বাস্তবতা হলো, ভারত এখনো বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি। দেশটিতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে এবং উৎপাদন খাতও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

তবুও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘমেয়াদে যদি সম্পদশালী ব্যক্তি এবং দক্ষ জনশক্তির দেশত্যাগ চলতে থাকে, তাহলে তার প্রভাব পড়তে পারে।

কারণ ধনী উদ্যোক্তারা শুধু সম্পদই নিয়ে যান না, তারা বিনিয়োগ, নতুন কর্মসংস্থান এবং কর রাজস্বেরও বড় উৎস।
অন্যদিকে একজন দক্ষ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা গবেষকের বিদেশে চলে যাওয়া মানে দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতারও কিছুটা ক্ষতি।
তবে এই চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে।

অনেক ভারতীয় প্রবাসী বিদেশে সফল হওয়ার পর নিজ দেশেও বিনিয়োগ করছেন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন, নতুন উদ্যোগে অর্থ দিচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ভারতের সংযোগ বাড়াচ্ছেন।

এ কারণেই কিছু অর্থনীতিবিদ “ব্রেন ড্রেন”এর পরিবর্তে “ব্রেন সার্কুলেশন” শব্দটি ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ মেধা দেশ ছাড়লেও, তাদের অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ আবার দেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই ইতিবাচক দিকটি শক্তিশালী করতে হলে দেশীয় পরিবেশ আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

গবেষণায় বিনিয়োগ, উদ্ভাবনের সুযোগ, সহজ ব্যবসা পরিচালনা, দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা এসব বিষয়কে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার অর্থনীতি নয়, তার মানুষও। যদি মেধা ও মূলধন দুটিই ধীরে ধীরে দেশের বাইরে চলে যায়, তাহলে সেই শূন্যতা পূরণ করতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। তাই উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি শুধু নতুন ভবন বা বড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং দেশের মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ সেই দেশেই গড়তে উৎসাহিত করার মধ্যেই নিহিত।

আরো খবর ➔
আর্জেন্টিনায় অর্থনৈতিক সংকটে মানুষ ডলার জমাচ্ছে—নিজ দেশের মুদ্রার উপর আস্থা হারাচ্ছে কেন?