ডেস্ক: ইন্টারনেট বলতে আমরা সাধারণত যা ব্যবহার করি, সেটি পুরো ইন্টারনেটের খুব ছোট একটি অংশ। সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজে পাওয়া ওয়েবসাইটগুলোর বাইরেও রয়েছে আরেকটি বিশাল জগৎ, যেখানে সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে প্রবেশ করা যায় না। সেই জগতের একটি অংশের নাম ডার্ক ওয়েব। বছরের পর বছর ধরে এটি রহস্য, অপরাধ এবং গোপন লেনদেনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অনেকে বলেন, ডার্ক ওয়েবে টাকা দিলেই নাকি যেকোনো কিছু কেনা যায়। অস্ত্র থেকে শুরু করে চুরি হওয়া তথ্য, জাল পাসপোর্ট, হ্যাকার ভাড়া সবকিছুই নাকি সেখানে বিক্রি হয়। কিন্তু এসবের কতটা সত্যি, আর কতটা কল্পকাহিনি?
আমরা অনেক সময় ডার্ক ওয়েব এবং ডিপ ওয়েব এর মধ্যে কনফিউজ হয়ে যাই।তবে ডার্ক ওয়েব আর ডিপ ওয়েব এক কিন্তু একইজিনিস নয়।
ডিপ ওয়েব হলো ইন্টারনেটের সেই অংশ, যেখানে পাসওয়ার্ড ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। যেমন—ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট, হাসপাতালের নথি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পোর্টাল।
অন্যদিকে ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করতে বিশেষ ধরনের ব্রাউজার ব্যবহার করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো “টর” ব্রাউজার। এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন রাখতে সাহায্য করে। মূলত গোপনীয় যোগাযোগের জন্য এটি তৈরি হলেও পরে অপরাধী চক্রও এর অপব্যবহার শুরু করে।
মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই, ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডার্ক ওয়েবে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ পণ্য ও সেবার বাজার গড়ে উঠেছে।
তদন্তে দেখা গেছে, সেখানে চুরি হওয়া ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, হ্যাক হওয়া অ্যাকাউন্ট, ভুয়া পরিচয়পত্র, জাল পাসপোর্ট, মাদক এবং বিভিন্ন ধরনের ম্যালওয়্যার কেনাবেচার চেষ্টা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় ব্যবসাগুলোর একটি হলো চুরি হওয়া ব্যক্তিগত তথ্য।
কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্য ফাঁস হলে সেই ডাটাবেস অনেক সময় ডার্ক ওয়েবের বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে বিক্রির জন্য তুলে দেওয়া হয়। সেখানে ই-মেইল ঠিকানা, পাসওয়ার্ড, ফোন নম্বর কিংবা ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়।
এছাড়া “র্যানসমওয়্যার অ্যাজ এ সার্ভিস” নামে নতুন একটি মাধ্যম দেখা গেছে। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নিজে হ্যাকিং জানেন না, তিনিও টাকা দিয়ে অন্যের তৈরি ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করার সুযোগ পান। আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ধরনের অপরাধ বেড়েছে।
তবে সিনেমায় যেভাবে দেখানো হয়, বাস্তবতা সবসময় তেমন নয়।
অনেকে দাবি করেন, ডার্ক ওয়েবে নাকি ভাড়াটে খুনি বা যেকোনো অবৈধ সেবা সহজেই পাওয়া যায়।
কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, এ ধরনের বিজ্ঞাপনের বড় অংশই প্রতারণা। অনেক ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার পর আর কোনো যোগাযোগই থাকে না।
অর্থাৎ, ডার্ক ওয়েবে অপরাধ যেমন আছে, তেমনি অপরাধীদের প্রতারণাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়।
গত কয়েক বছরে এফবিআই, ইউরোপোল এবং বিভিন্ন দেশের যৌথ অভিযানে “সিল্ক রোড”, “আলফাবে”, “হাইড্রা”সহ একাধিক বড় ডার্ক ওয়েব মার্কেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযানে হাজার হাজার অবৈধ পণ্যের তালিকা, কোটি কোটি ডলারের ডিজিটাল মুদ্রা এবং অসংখ্য সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডার্ক ওয়েব শুধু অপরাধের জায়গা,এমন ধারণাও পুরোপুরি ঠিক নয়।
কিছু দেশে যেখানে সংবাদমাধ্যম বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, সেখানে মানবাধিকারকর্মী, অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং হুইসেলব্লোয়াররাও নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
অর্থাৎ, প্রযুক্তিটি নিজে অপরাধ নয়। এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে সেটি বৈধ না অবৈধ।
এখন প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ইতোমধ্যে কোনো তথ্য ফাঁসের ঘটনায় চুরি হয়ে গেছে। পরে সেই তথ্য ডার্ক ওয়েবের বাজারে বিক্রির জন্য উঠে আসে।
সেখান থেকে সাইবার অপরাধীরা তথ্য কিনে ব্যাংক জালিয়াতি, পরিচয় চুরি বা অনলাইন প্রতারণার মতো অপরাধ ঘটাতে পারে।
তাই স্ট্রং পাসওয়ার্ড ব্যবহার, দুই ধাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রাখা এবং অচেনা লিংকে ক্লিক না করার পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, ডার্ক ওয়েব এমন একটি জগৎ, যেখানে রহস্য যেমন আছে, তেমনি বাস্তব অপরাধও রয়েছে। তবে এটিকে ঘিরে প্রচলিত অনেক গল্প অতিরঞ্জিত বা প্রমাণহীন।অদৃশ্য এই ডিজিটাল জগতের সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু সেখানে কী বিক্রি হয়, তা নয়। বরং বিপদ হলো,আপনার অজান্তেই যদি আপনার তথ্য সেই বাজারের পণ্যে পরিণত হয়। আর তাই ডিজিটাল যুগে সচেতনতা শুধু একটি অভ্যাস নয়, এটি এখন নিজের নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।


