ডেস্ক: দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে।তাহলো সাধারণ মানুষ নিজেদের সঞ্চয় স্থানীয় মুদ্রায় না রেখে ডলারে জমাতে শুরু করেছে। বাজারে, ব্যাংকে, এমনকি ব্যক্তিগত লেনদেনেও ডলারের চাহিদা বাড়ছে।
এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে,কেন মানুষ নিজের দেশের মুদ্রার ওপর আস্থা হারাচ্ছে?
গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনার অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি যেটার ধাক্কা খেয়েছে, তা হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি।আর্জেন্টিনায় বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ২০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, আজ যে জিনিসের দাম ১০০ পেসো, কয়েক মাস পরেই তা ২০০ বা ৩০০ পেসো হয়ে যাচ্ছে। মানুষের উপার্জিত টাকার ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।পেসোর মান প্রতিনিয়ত কমছে। মানুষ যখন দেখে যে আজ ব্যাংক বা ঘরে রাখা টাকার মূল্য কালকের চেয়ে কমে গেছে, তখন তারা তাদের জমানো টাকা ডলার বা অন্য কোনো স্থিতিশীল মুদ্রায় রূপান্তর করে ফেলে।
International Monetary Fund এর তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে স্থানীয় মুদ্রা “পেসো”র ক্রয়ক্ষমতা খুব দ্রুত কমছে।
এই পরিস্থিতিতে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি মুদ্রা খুঁজছে, যেটা তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং সেই জায়গায় ডলারই সবচেয়ে বড় বিকল্প হয়ে উঠছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো মুদ্রার অবমূল্যায়ন।
আর্জেন্টিনায় ডলারকে “নিরাপদ আশ্রয়” হিসেবে দেখা হয়। এমনকি স্থানীয় অনেক পণ্যের দাম ও,কিছু ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া বা সম্পত্তির লেনদেনও ডলারে হচ্ছে।
অর্থাৎ, স্থানীয় মুদ্রা ধীরে ধীরে দৈনন্দিন লেনদেন থেকে সরে যাচ্ছে।।পেসোর মান বারবার কমে যাওয়ায় মানুষ মনে করছে আজ যে টাকা আছে, কাল তার মূল্য আরও কমে যাবে।ফলে তারা দ্রুত ডলারে রূপান্তর করছে তাদের সঞ্চয়।এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “বিশ্বাস”।মুদ্রা শুধু কাগজ নয় এটি মানুষের বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।যখন মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, তখন মুদ্রাও তার শক্তি হারায়।
আর্জেন্টিনায় এই আস্থার সংকট ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে।
আর্জেন্টিনা গত কয়েক দশকে বহুবার অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। ২০০১ সালের চরম আর্থিক বিপর্যয় মানুষের স্মৃতিতে এখনো তাজা। মানুষ সরকারের অর্থনৈতিক নীতি বা ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদী আস্থা রাখতে পারে না।ফলে বিভিন্ন সময় অর্থনৈতিক সংকট,সরকারি নীতির পরিবর্তন,এবং ঋণ সংকট সব মিলিয়ে মানুষ এখন ঝুঁকি নিতে চায় না।
World Bank এর মতে, যখন কোনো দেশে মুদ্রার স্থিতিশীলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখন মানুষ বিকল্প মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়ে।যা “ডলারাইজেশন” প্রবণতা হিসেবে পরিচিত।এই ডলারাইজেশন এখন আর্জেন্টিনায় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
তবে এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়।
এতে পুরো অর্থনীতিতেই চাপ তৈরি হয়।যখন মানুষ পেসো ব্যবহার কমিয়ে দেয়,তখন সরকারের পক্ষে মুদ্রানীতি কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা বাড়লে
অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো,ডলার সবার জন্য সহজলভ্য নয়।
যাদের কাছে বেশি টাকা আছে, তারা ডলার কিনতে পারছে,কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ এই সুবিধা পাচ্ছে না।
ফলে সামাজিক বৈষম্যও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
সরকার তাদের ঘাটতি মেটাতে একের পর এক টাকা ছাপিয়েছে, যার ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়লেও উৎপাদন বাড়েনি। এই নীতি মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে। এছাড়া সরকার ডলার কেনাবেচায় সীমাবদ্ধতা,ব্যাংকিং নিয়ম কঠোর করা,এবং কালোবাজার নিয়ন্ত্রণেরও চেষ্টা।তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, মানুষ বিকল্প পথই খুঁজে নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আর্জেন্টিনায় ডলার জমানোর প্রবণতা শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয় এটি একটি আস্থার সংকটের প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়,
মানুষ কি আবার নিজেদের মুদ্রায় ফিরে আসবে?
নাকি ডলারই হয়ে উঠবে প্রধান ভরসা?
উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার,
যতদিন পর্যন্ত স্থিতিশীলতা না আসছে,
ততদিন মানুষের কাছে নিরাপদ মনে হওয়া বিকল্পের দিকেই ঝোঁক থাকবে।


