লন্ডনে “রেস্টুরেন্ট ইনভেস্টমেন্ট” আড়ালে অর্থ ঘোরানো!

লন্ডনে “রেস্টুরেন্ট ইনভেস্টমেন্ট” আড়ালে অর্থ ঘোরানো!

ডেস্ক: বিশ্বের অন্যতম আর্থিক কেন্দ্র লন্ডন। বৈধ বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বহুরকমের বৈচিত্র্যপূর্ন কর্মের সুনামে সুপ্রতিষ্ঠিত এই শহর। তবে একই সঙ্গে অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং নিয়েও যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় রয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের একাংশের পর্যবেক্ষণ নথির মতে, কিছু ক্ষেত্রে “রেস্টুরেন্ট ইনভেস্টমেন্ট” নীতি ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ বৈধ আয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে।

রেস্টুরেন্ট খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়,কারন এটি উচ্চ নগদ অর্থের ব্যবসা। যদিও যুক্তরাজ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট বেড়েছে, তবু ছোট ও মাঝারি আকারের বহু রেস্টুরেন্টে নগদ লেনদেন এখনও উল্লেখযোগ্য।

দ্বিতীয়ত, নতুন রেস্টুরেন্ট খোলা তুলনামূলক সহজ।একটি কোম্পানি নিবন্ধন, ভাড়া চুক্তি, লাইসেন্স ও সীমিত পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করা যায়।

কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য তদারকি করে Companies House। বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত পরিচালক পরিবর্তন বা শেয়ার হস্তান্তরের সুযোগ থাকায় মালিকানা কাঠামো কখনও কখনও জটিল হয়ে ওঠে।

যুক্তরাজ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কাজ করছে National Crime Agency এবং আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে Financial Conduct Authority। তাদের ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাশ-ইনটেনসিভ ব্যবসা অবৈধ অর্থ সাদা করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহৃত হতে পারে।
পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে,
বিক্রির পরিমাণ অতিরঞ্জিত দেখানো, ভুয়া সরবরাহকারী বিল তৈরি ইত্যাদি ।

বিশেষজ্ঞরা “লেয়ারিং” ও “ইন্টিগ্রেশন” ধাপের কথা উল্লেখ করেন।
প্রথম ধাপে অবৈধ অর্থ বৈধ ব্যবসায় ঢোকানো হয়। দ্বিতীয় ধাপে জটিল লেনদেনের মাধ্যমে উৎস আড়াল করা হয়। শেষ ধাপে সেই অর্থকে বৈধ লাভ বা বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো হয়। রেস্টুরেন্টে বিনিয়োগ, শেয়ার বিক্রি বা অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে এই অর্থ পাচার প্রক্রিয়া আড়াল করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে,এমনটাই বলছেন আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষকেরা।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণকারী সংস্থা Financial Action Task Force সতর্ক করে বলেছেন, যেসব খাতে নগদ লেনদেন বেশি এবং সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ প্রবাহ স্বাভাবিক, সেসব খাতে কড়াকড়ি নজরদারি প্রয়োজন। লন্ডনের বহুজাতিক ব্যবসা পরিবেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসা স্বাভাবিক; তবে তহবিলের উৎস যাচাই না করলে ঝুঁকি বাড়ে।

কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি রেস্টুরেন্টে অল্প সময়ের ব্যবধানে বড় অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে এবং দ্রুত শেয়ার হস্তান্তর হয়েছে। কোথাও আবার ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পরও ব্যয় মেটানো হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। যদিও প্রতিটি ঘটনাই অপরাধ প্রমাণ করে না, তবে প্যাটার্ন বিশ্লেষণে সন্দেহ তৈরি হয়।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করলে “Suspicious Activity Report” দাখিল করে। এই প্রক্রিয়া আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ছোট বিনিয়োগ বা অংশীদারিত্ব চুক্তির ক্ষেত্রে সবসময় ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহৃত না হলে নজরদারি ফাঁকি দেওয়া সম্ভব।

রেস্টুরেন্ট শিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, অধিকাংশ উদ্যোক্তা কঠোর প্রতিযোগিতার মধ্যে বৈধভাবে ব্যবসা চালান। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এই খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। ফলে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন,কয়েকটি সন্দেহজনক ঘটনার কারণে পুরো খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ তকমা দিলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বিষেজ্ঞদের সুপারিশ হলো,
উপকারভোগী প্রকৃত মালিকের তথ্য কঠোর যাচাই,তহবিলের উৎস প্রমাণ ছাড়া বড় অঙ্কের বিনিয়োগ গ্রহণ না করা,নগদ লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট বৃদ্ধি,স্বাধীন অডিট ও নিয়মিত হিসাব পর্যালোচনা ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহন করা।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বলছে, মানি লন্ডারিং প্রমাণ করা সময়সাপেক্ষ ও জটিল। কারণ অভিযুক্তরা প্রায়ই বৈধ ব্যবসা কাঠামোর আড়ালে লেনদেন করেন। তবু প্রযুক্তিনির্ভর ডেটা অ্যানালিটিক্স, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বাড়ানো হলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়—লন্ডনে “রেস্টুরেন্ট ইনভেস্টমেন্ট” কি কেবল বৈধ ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ, নাকি কোথাও কোথাও অবৈধ অর্থ ঘোরানোর কৌশল?

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বলছে, ঝুঁকি অস্বীকারের সুযোগ নেই; তবে কঠোর তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বৈধ উদ্যোক্তাদের আস্থা বজায় থাকবে। আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে লন্ডনের সুনাম ধরে রাখতে হলে এই খাতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা আরও জোরদার করাই এখন সময়ের দাবি।

আরো খবর ➔
মেক্সিকোতে বিমান বিধ্বস্ত, আহত ৪৯