ডেস্ক: বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাড়ি দিচ্ছেন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়। তবে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে নতুন এক উদ্বেগ।প্রবাসী ছাত্রদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টিউশন ফি ও লিভিং কস্টের আড়ালে বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন দেশের নানান অনুসন্ধানী সংস্থায়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, কিছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে।যার পরিমাণ শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, স্টুডেন্ট ভিসা তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় এবং বৈধভাবে অর্থ পাঠানোর সুযোগ থাকায় কিছু অসাধু চক্র এই পথ ব্যবহার করতে পারে।শিক্ষার্থীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তৃতীয় পক্ষ বিভিন্ন সময় অবৈধ অর্থ আদান প্রদান করে। ফলে প্রকৃত প্রেরক ও প্রাপক আড়ালে থাকে।
ব্যাংকিং সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু শিক্ষার্থীর অ্যাকাউন্টে নিয়মিত বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স জমা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত টিউশন ফি বা আনুমানিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আবার অনেক সময় কয়েক মাসের ব্যবধানে একাধিকবার বড় অংকের অর্থ ট্রান্সফার হচ্ছে, আবার দ্রুত অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ধরনের প্যাটার্নকে ‘মানি রাউটিং’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তবে প্রবাসী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছেন, বৈধ পারিবারিক সহায়তা বা এককালীন সঞ্চয় পাঠালেও তা অনেক সময় সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে স্থগিত, অতিরিক্ত ডকুমেন্টস দাবি কিংবা লেনদেন বিলম্বিত হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে।যার ফলে শিক্ষার্থীদের নানান ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ব্যয় কেবল টিউশন ফি নয়।
বাসাভাড়া, মেডিকেল ইসূ, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। তাই শুধু অঙ্কের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে প্রকৃত শিক্ষার্থীরাও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
এদিকে World Bank ও International Monetary Fund বলছে, বৈধ রেমিট্যান্স উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই প্রবাহ যেন স্বচ্ছ ও আইনসম্মত থাকে, তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।তাই আন্তর্জাতিক সংস্থা গুলোর এই তৎপরতা।
বাংলাদেশি ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার সমাধান হতে পারে তথ্যের স্বচ্ছতা ও আগাম ঘোষণা। শিক্ষার্থীদের উচিত টিউশন ফি ডকুমেন্টস , অফার লেটার, বাসাভাড়ার ডকুমেন্টস ও আর্থিক সহায়তার উৎস স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত রাখা। একইভাবে ব্যাংকগুলোরও প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর ঝুঁকি বিশ্লেষণ পদ্ধতি অবলম্বন করা, যাতে বৈধ ও অবৈধ লেনদেন আলাদা করা যায় সুনির্দিষ্টভাবে।
শুধু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই এটি সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালের একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দেখা গেছে, আয়রিশ আর্থিক নিরাপত্তা সংস্থা FraudSMART প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী অ্যাকাউন্টকে “মানি মিউল” হিসাবে শনাক্ত করেছে, যেখানে সম্ভাব্যভাবে অবৈধ অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত। এতে অনেক শিক্ষার্থীদের নামে মোবাইল ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলো ব্যবহার হয়েছে অর্থ পাচার বা ভিন্ন উদ্দেশ্যে।
অস্ট্রেলিয়ান পুলিশও তুলনামূলক সতর্কতা জারি করেছে; তারা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ক্রিমিনাল নেটওয়ার্কগুলো ক্রয় করতে চাইছে আর এর মাধ্যমে অর্থ পাচার চালানো হচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষার্থীরা এর ফলে অপরাধ জালে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি ভিসা রদ কিংবা কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজন প্রতেকটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কঠর নজরদারি
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—প্রবাসী শিক্ষার্থীদের নামে হওয়া বড় অঙ্কের লেনদেন আসলেই শিক্ষাব্যয়ের ব্যয়, নাকি অন্য আর্থিক প্রবাহের আড়াল? আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নজরদারি বাড়ছে কিন্তু ভারসাম্য রক্ষা না হলে প্রকৃত শিক্ষার্থীরা জটিলতার মুখোমুখি হবে।


